শাবানা - ছবি: সংগৃহীত
মানুষের হৃদয়ে তাঁর মতো আবেগী হয়ে এখন পর্যন্ত ধরা দিতে পারেনি কেউ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী তিনি। বহু বছর অভিনয়ের বাইরে। তবুও তার নামটি এখনো সমানভাবে উচ্চারিত হয়। তিনি শাবানা।
মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি নাম লিখিয়েছিলেন সিনেমায়, এরপর বাকিটা ইতিহাস। তাঁকে ছাড়া বাংলা সিনেমার ইতিহাস লেখা অসম্ভব, তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা। দেশের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের তালিকা করলে এখনো তার নামটিই সবার উপরেই রাখতে হবে।
১৯৫৩ সালের ১৫ জুন শাবানার জন্ম হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে। বাবার নাম ফয়েজ চৌধুরী, যিনি একজন টাইপিস্ট ছিলেন। মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই শাবানা ছিলেন খানিক চঞ্চল আর অনেক বেশি লাজুক। শাবানা ঢাকার গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হলেও তার পড়ালেখা ভালো লাগত না। পড়াশোনায় মন ছিল না, তাই মাধ্যমিকেই ইতি টানেন।
শাবানার জন্ম নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। কিন্তু এই নামে চলচ্চিত্র জগতের তেমন কেউই তাকে চেনেন না বা চিনবেনও না। সবার কাছে তিনি শাবানা নামেই পরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্রের একটি আজন্ম ব্র্যান্ড এই নামটি। কিন্তু আফরোজা সুলতানা রত্না থেকে তিনি কীভাবে হলেন শাবানা?
শাবানা - ছবি: সংগৃহীত
চলচ্চিত্রকার এহতেশাম ছিলেন অভিনেত্রীর চাচা। বাবার খালাতো ভাই। তার মাধ্যমেই শাবানার চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে। ১৯৬২ সালে ১১ বছরে বয়সে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ হয়েছিল ‘রত্না’ নামে। ১৯৬৬ সালে উর্দু ছবি ‘চকোরী’তে রত্না থেকে তিনি হয়ে যান শাবানা।
বাবা ফয়েজ চৌধুরী মেয়ে রত্নাকে নিয়ে প্রায়ই এফডিসিতে যেতেন। চলচ্চিত্রকার এহতেশাম তখন ‘নতুন সুর’ নামে একটি ছবির কাজ করছেন। সেটা ছিল ১৯৬১ সালের কথা। একজন শিশুশিল্পী দরকার ছিল সেখানে। শিশু রত্নাকে দেখে এহতেশাম পছন্দ করলেন। এভাবেই ‘নতুন সুর’ ছবিতে প্রথম অভিনয় জীবন শুরু হলো শাবানার।
তবে এরও অনেক পরে ১৯৬৬ সালে ‘চকোরী’ ছবি থেকে তার রত্না নাম পাল্টে নতুন নাম রাখা হলো শাবানা। ‘শাবানা’ নামটি দিলেন এহতেশাম নিজেই। নায়িকা হওয়ার আগে শাবানা শিশু অভিনেত্রী হিসেবে ‘তালাশ’, ‘সাগর’, ‘ভাইয়া’ ছবিতে অভিনয় করেন। নায়িকা হিসেবে তার অভিনয় শুরু ১৯৬৬ সালে ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ছবিতে। ওই ছবিতে সোনাভানের ভূমিকায় ছিলেন শাবানা। তার নায়ক ছিলেন কাসেম। ‘চকোরী’ ছবিতে কাজ করার আগে ‘জংলী মেয়ে’ ছবির কাজ শুরু করেন তিনি। ‘জংলী মেয়ে’ ছবিতে তার নায়ক ছিলেন আজিম। ‘চকোরী’ মুক্তি পায় ১৯৬৭ সালে। নায়ক ছিলেন নাদিম। এই ছবিতে শাবানা ও নাদিমের অসম্ভব নাম হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে নায়িকা হিসেবে চাঁদ আওর চাঁদনী, ভাগ্যচক্র ও কুলীতে; ১৯৬৯ সালে দাগ, (মুক্তি; ১৯৭০ সালে) পায়েল, সমাপ্তি, ছদ্মবেশী, বাবুল, মধুমিলন এবং একই অঙ্গে এত রূপ ছবিতে অভিনয় করেন।
স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিখ্যাত ছবি ‘ওরা এগারোজন’-এ অভিনয় করেন শাবানা। ওই বছরই ‘অবুঝ মন’ ছবিতে অভিনয় করে সারাদেশে অসম্ভব খ্যাতি পেলেন। ১৯৭২ সালে এ দুটি ছবিসহ তার আরও ছয়টি ছবি রিলিজ হয়। সেগুলো হলো—সমাধান, ছন্দ হারিয়ে গেল, এরাও মানুষ, মুন্না আওর বিজলী, চৌধুরী বাড়ি এবং স্বীকৃতি।
শাবানা অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ভাত দে’, ‘অবুঝ মন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘সত্য মিথ্যা’, ‘রাঙ্গা ভাবী’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘ওরা এগারোজন’, ‘বিরোধ’, ‘আনাড়ি’, ‘সমাধান’, ‘জীবনসাথী’, ‘মাটির ঘর’, ‘লুটেরা’, ‘সখী তুমি কার’, ‘কেউ কারো নয়’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘দুঃসাহস’, ‘লক্ষ্মীর সংসার’, ‘পুত্রবধূ’, ‘আক্রোশ’, ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’ প্রভৃতি। পাকিস্তান আমলে উর্দু ছবিতে নাদিমের সঙ্গে অভিনয় করে সফল হয়েছিলেন শাবানা। রাজ্জাক, ওয়াসিম, আলমগীরের সঙ্গেও শাবানার জুটি ছিল হিট।
শাবানা একবার জানিয়েছিলেন, রাজ্জাক ও আমি জুটি হিসেবে যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, ঠিক তখনই আলমগীরের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হলাম। সামাজিক ছবিতে আমরা সফল হয়েছিলাম। আমার ক্যারিয়ার গঠনে অনেক পরিচালকের অবদান রয়েছে। এহতেশাম চাচা যদি সুযোগ না দিতেন তাহলে হয়তো ‘শাবানা’ হতে পারতাম না। সামাজিক চরিত্রে নতুন ইমেজে আমাকে পরিচিত করার ব্যাপারে কাজী জহির, মমতাজ আলী, কামাল আহমেদের অবদান কোনো দিন মন থেকে সরে যাবে না।
শাবানা - ছবি: সংগৃহীত
১৯৬৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত শাবানা ঢাকার ফিল্মে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কয়েকশ’ ছবির নায়িকা ছিলেন। পোশাকী, সামাজিক, অ্যাকশন সব ছবিতেই তিনি সফল হয়েছিলেন। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কয়েকশ’ বাংলা ছবির নায়িকা ও কেন্দ্রীয় চরিত্রে শাবানা অভিনয় করেন।
তিনি মোট ১০ বার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে ৯ বার এবং প্রযোজক হিসেবে একবার। এই রেকর্ডও আজ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি। ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন শাবানা। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রযোজক সমিতি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, আর্ট ফোরাম পুরস্কার, নাট্যসভা পুরস্কার, কামরুল হাসান পুরস্কার, নাট্যনিকেতন পুরস্কার, ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার ও কথক একাডেমি পুরস্কার।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালে সরকারি কর্মকর্তা ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন তিনি। দুজনে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন প্রযোজনা সংস্থা এসএস প্রোডাকশন। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে নির্মিত হয়েছে অনেক জনপ্রিয় সিনেমা।
আরো পড়ুন: আলমগীর : বাংলা চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি
বিয়ের পর নায়িকাদের জনপ্রিয়তা কমে যায়, সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে ২১ বছর বয়সেই বিয়ে করে সংসার ও সিনেমা দুটোই সমান্তরালভাবে সামলেছেন শাবানা। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে এসে অভিনয় কমিয়ে দেন এবং হঠাৎ করেই সিনেমা থেকে বিদায় নেন তিনি। এরপর স্থায়ী হন যুক্তরাষ্ট্রে। মাঝেমধ্যে দেশে আসেন, কিছুদিন থেকে আবার চলে যান শাবানা।
তবুও শাবানা নামটি এখন পর্যন্ত দর্শকের মুখে মুখে। এ জন্যই শাবানা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একজন কিংবদন্তি হয়ে থাকবেন আজীবন।
আই.কে.জে/