ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের আকস্মিক সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন তারা।
গতকাল বুধবার (২৫শে ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একদল কর্মকর্তার বিক্ষোভের মুখে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই যেভাবে গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, তাতে এ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার আহসান এইচ মনসুরকে চার বছরের জন্য গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছিল।
নিয়োগ বাতিল প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর সুখবর ডটকমকে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। টেলিভিশন সংবাদে তিনি নতুন গভর্নর নিয়োগের কথা জানতে পারেন এবং পরে অফিস ত্যাগ করেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, আহসান এইচ মনসুর দায়িত্বগ্রহণ করেন চরম অর্থনৈতিক চাপের সময়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া, টাকার বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা এবং আমদানির চাপ সেসময় ছিল চরমে।
অনেকে মনে করেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে আহসান এইচ মনসুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, বিনিময় হারের অসামঞ্জস্য দূর এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ব্যাংকিং খাত সংস্কার শুরু করেন তিনি।
এর মধ্যে তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করেন, সুশাসন জোরদার করেন এবং খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি' গঠনের উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়াকে 'প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের বিষয়' বলে উল্লেখ করেছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, 'নির্বাচিত সরকারের গভর্নর পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকলেও এর সময় ও প্রক্রিয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সংকটকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য যথেষ্ট দক্ষতা ও কৌশলগত বোঝাপড়া প্রয়োজন।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দ্বীন ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'বাংলাদেশ যেন পেছনের দিকে হাঁটছে।'
নতুন নিয়োগ দেওয়া গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন শিল্পপতি হওয়ায় তাকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। দ্বীন ইসলাম প্রশ্ন করেন, 'কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এমন একজন ব্যবসায়ী দ্বারা পরিচালিত হয়, যার খাতটি তাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তবে ব্যাংক কীভাবে স্বাধীন থাকবে?'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, 'সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো মনসুরকে আরও সম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়া যেত। এখন বিদেশি ব্যবসায়িক অংশীদাররা প্রশ্ন করলে কী উত্তর দেওয়া হবে, তা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান প্রশ্ন তুলেছেন—সরকার কি সত্যিই ব্যাংকিং খাতের সংস্কার চায়? তিনি মনে করেন, একজন ব্যবসায়ীর লক্ষ্য বাজার ও করপোরেট স্বার্থের দিকে থাকতে পারে, অথচ গভর্নরের মূল দায়িত্ব হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, 'আহসান এইচ মনসুর অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি। তবে বিএনপি আমলে তাকে সরিয়ে দেওয়া বিস্ময়কর নয়।'
তিনি মনে করেন, 'যতক্ষণ না বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ গভর্নরের নিয়োগ অর্থমন্ত্রীর পছন্দের ওপরই নির্ভর করবে।'
আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের পর সরকার মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
এ বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকে এই পরিবর্তন নতুন সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগের অংশ।'
'শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। আরও অনেক পরিবর্তন প্রক্রিয়াধীন আছে,' যোগ করেন তিনি।
খবরটি শেয়ার করুন