সোমবার, ৩১শে মার্চ ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বালক, কিশোর ধর্ষণের বিষয়ে আইনে কী আছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:১৪ অপরাহ্ন, ১৭ই মার্চ ২০২৫

#

ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জে গত ৮ই মার্চ ২০ বছর বয়সী এক তরুণ ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার তিনদিন পর ১১ই মার্চ মামলা নথিভুক্ত করা হয় বলে জানান নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দিন ভুক্তভোগীর এক প্রতিবেশী তাকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করেন। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘বলাৎকার’ হিসেবে মামলাটি রুজু হয়। কারণ, ১৬ বছর বয়সের উপরে ধর্ষণের শিকার ছেলেদের জন্য দেশে আলাদা কোনো আইন নেই।

ফলে বালক, কিশোর ও তরুণরা ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়। তারা ধর্ষণের শিকার হলেও বিদ্যমান আইনে প্রতিকার পাওয়ার বিধান ও সুযোগ না থাকায় বিচার চাইতে হয় ভিন্ন আইনে। এসব কারণে ভুক্তভোগীদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা কম বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। খবর বিবিসি বাংলার। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরুষ নির্যাতনের বিষয়ে সচেতনতা না থাকার কারণে এখনও পুরনো আইন দিয়েই এ সম্পর্কিত অভিযোগের বিচার কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এতে করে ভুক্তভোগীদের জন্যে যথাযথ বিচার প্রায় সময়ই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

দেশে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে যে রকম আলোচনা দেখা যায়, তাতে অনেকাংশেই উপেক্ষিত থাকে ছেলে শিশু বা পুরুষদের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার নানা তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলেও পুরুষদের ক্ষেত্রে খুব কম সময়ই তা পাওয়া যায়। এতে আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হন ভুক্তভোগীরা।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে ছেলেদের বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে, তারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আসকের তথ্যমতে, গত দুই বছরে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী ১১১ ছেলে ধর্ষণের শিকার হয়। যার মধ্যে মামলা হয় শুধু ৫৫টি ঘটনার।

আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ২২৬ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হন। যার মধ্যে মামলা হয় ১৪৬টি। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাঁচ বছরে ২৪ জন বালক, ছেলে শিশু, কিশোর ও তরুণ ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হন। এ সময়ে মামলা হয় ১৪টি। ২০২৩ সালে ৭৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৩৬ ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন করা হয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায়। এ আইন অনুযায়ী, পুরুষের দ্বারা শুধু নারী ধর্ষণের শিকার হতে পারেন। কোনো ছেলে ধর্ষণের শিকার হলে তার জন্য আইনে প্রভিশন (বিধান) নেই। ছেলেদের ধর্ষণের বিষয়টা আইনে চিন্তা করা হয়নি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে ২০০০ সালে একটি আইন প্রণীত হয়। এ আইনে শুরুতে শুধু নারী ও ১৬ বছর বয়সের কম বয়সী মেয়ে শিশুদের কথা বলা হলেও হাইকোর্টের এক আদেশের পর ছেলে শিশুদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ১৬ বছরের বেশি বয়সী কোনো ছেলে ধর্ষণের শিকার হলে প্রচলিত আইনে তা বিচারের সুযোগ নেই।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের জন্যে কোনো ধারা না থাকায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এ  ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী মামলা রুজু করতে হয়। যেমনটা দেখা যায়, উপরে আলোচিত নারায়ণগঞ্জের ঘটনায়। 

আইনের এ ধারায় ‘আন-ন্যাচারাল অফেন্স’ বা ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধের’ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ যদি স্বেচ্ছায়ও কোনো পুরুষ, নারী বা পশু-প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোনো বিভেদ হওয়া উচিৎ নয়। ধর্ষণের মতো ঘটনাকে ছোটো করে দেখার সুযোগ নেই, তা নারী, বা পুরুষের ক্ষেত্রে হোক। ছেলেদের সঙ্গেও এটি জোরপূর্বক ঘটানো হচ্ছে। ফলে এ ক্ষেত্রেও সমান শাস্তি হওয়া উচিৎ।

তৃতীয় লিঙ্গের কেউ ধর্ষণের শিকার হলে, তার জন্যেও আলাদা কোনো আইন নেই। তাদেরও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ছেলেরা ধর্ষণের শিকার হলে বর্তমানে ৩৭৭ ধারায় মামলা করা হলেও ‘বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে আইনে আসা প্রয়োজন’ বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

তারা জানান, ৩৭৭ ধারায় মামলা করার কারণে শাস্তির বিধানেও আসে তারতম্য। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় কারো অপরাধ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বা মৃত্যুদণ্ড। ৩৭৫ ধারায় কোনো অপরাধ প্রমাণ হলে অপরাধীর শাস্তি হবে ১০ বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

আইনজীবীদের মতে, ধর্ষণের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল থাকা দরকার। কারণ, এটা অন্য অপরাধের সঙ্গে মেলে না।

এইচ.এস/


ধর্ষণ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন