ফাইল ছবি
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছর পর প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন, মানসিকসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নিতে। একইসঙ্গে তাদের দেশে ফিরে রাজনীতির মাঠে নামতে। দেশের ভেতর আত্মগোপনে ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে ৭ই, ১৭ই ও ২৬শে মার্চে কর্মসূচি পালন করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতা এসব তথ্য জানিয়েছেন সুখবর ডটকমকে। তারা বলছেন, প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্য শেখ হাসিনা এই নির্দেশ দেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করে, মার্চ মাসের এই তিনটি দিবস পালন আওয়ামী লীগের কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণে গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি শীর্ষ নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। এতে তিনি দিল্লি থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের এক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের বাসায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা সুখবর ডটকমকে বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, শেখ হাসিনা অত্যন্ত ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ওই তিনটি দিবস পালনের বিষয়ে। তিনি বুঝে নিতে চান, দেশের জাতীয় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ওই তিনটি ঐতিহাসিক দিন পালনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বাধা দেয় কিনা।
ওই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই বিদেশে, বাকিরা কারাগারে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে। এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় কর্মসূচি সফল হওয়ার সম্ভাবনা যে নেই, সেটা দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জানে। কিন্তু কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ যাচাই করতে চায়, তারেক রহমান সরকারের দলটির প্রতি আসলে মনোভাব কেমন, বা দলটির বিষয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী।
ওই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বিশ্বাস করেন, এবারের জাতীয় নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে। ফলে বিএনপি অনেকটাই 'সহানুভূতিশীল' থাকবে আওয়ামী লীগের প্রতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির 'সহযোগিতা' প্রায়ই পাচ্ছেন তারা।
সবশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও। অবশ্য এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে 'পুনর্বাসনের' চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কৌশল দুই ধারায় এগোচ্ছে—মাঠে সীমিত উপস্থিতি দেখানো এবং একই সঙ্গে সরকারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। কার্যালয় খোলা ও জামিন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে দলটির রাজনৈতিক পথচলা কতটা উন্মুক্ত বা সীমিত হবে।
দলটির নেতাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে বিএনপি কিছুটা নমনীয় বলে মনে করছেন। তবে কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের জামিনপ্রাপ্তি ও মুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা আসে কিনা, সেটাও দেখতে চায় দলটি।
আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা, মধ্যম ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জামিন পেতে শুরু করলে সাংগঠনিক তৎপরতা কিছুটা বাড়বে। নেতাদের জামিন পাওয়ার বিষয়টি যাতে সহজ হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম এবং প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের সহায়তা পেতে দলটির পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে।
জামিন পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা স্বাভাবিক হলে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের কেউ কেউ দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। এখনই হয়তো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা কিংবা বড় নেতারা ছাড়া পাবেন না। তবে মধ্যম ও নিম্ন সারির নেতা–কর্মীরা ছাড়া পেলে দলে কিছুটা প্রাণসঞ্চার হবে।
সূত্র বলছে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের মূলত আস্তে আস্তে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কিছু কিছু দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা চলছে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের নেতারা এসব উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের পরোক্ষ সহায়তা বা সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।
১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। আওয়ামী লীগের নেতাদের কারও কারও মতে, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে অবস্থানরত নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব নেতা বলছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে এবং ভোট প্রতিহত করার কোনো কর্মসূচিও দেয়নি দলটি। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার অন্তত প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান না–ও নিতে পারে।
তবে দলের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির কাছ থেকে প্রকাশ্য সহযোগিতা আশা করা ঠিক হবে না। সরকার অনেক ক্ষেত্রে ‘না দেখার’ কৌশল নিতে পারে, আবার পরিস্থিতিভেদে কঠোরও হতে পারে।
শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কয়েক নেতা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ওই নিষেধাজ্ঞা দুটি কারণে অবৈধ। এক. আওয়ামী লীগ এমন কোনো অপরাধ করেনি যে কারণে সন্ত্রাস দমন আইনে তাদের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। দুই. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ছিল অবৈধ। সেই সরকারের নির্দেশ বৈধ হতে পারে না।
এরপরই শেখ হাসিনা বিএনপি সরকারের নাম উল্লেখ না করে বলেন, আমরা আশা করব বর্তমান সরকার এই অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। যদি না করে, তখন আমরা আমাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবো। কর্মসূচি ঘোষণা করবো।
তবে শেখ হাসিনা ২৪শে ফেব্রুয়ারির বৈঠকে যেভাবে নেতাদের দেশে ফিরতে মানসিক ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন তাতে কোনো কোনো নেতার ধারণা তিনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক বার্তা পেয়ে থাকতে পারেন। কয়েক নেতা বলেন, তার কণ্ঠে পরিচিত আত্মবিশ্বাস ধরা পড়েছে বৈঠকের ভাষণে।
২৪শে ফেব্রুয়ারির বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন না। তিনি অসুস্থ বলে জানা গেছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, এসএম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, সাইফুল আলম নাদেল, মির্জা আজম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। ১৭ই মার্চ তার জন্মশতবার্ষিকী। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস।
খবরটি শেয়ার করুন