ছবি: ডয়চে ভেলে
কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ ও নবগঠিত সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে নতুন নিয়োগের গুঞ্জনের মধ্যে গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি কার্যালয় ছাড়তে বাধ্য হন বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল বিতর্কিত গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আহসান মনসুর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পান। তাকে সরিয়ে দেওয়ায় তারেক সরকারের উপর চটেছেন ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালে তার 'আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী' হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেওয়া প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনাম।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে মাহফুজ আনাম বিবেচনা করছেন 'অমার্জিত, অমর্যাদার ও মবের চাপে নেওয়া পদক্ষেপ' হিসেবে। তার মতে, যৌক্তিকতা, প্রয়োগ পদ্ধতি এবং তাৎপর্য বা অর্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে আহসান মনসুরকে অপসারণের সরকারি সিদ্ধান্ত এই তিন ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। তাৎপর্যের দিক বিবেচনায় এটি (সরকারি সিদ্ধান্ত) প্রায় দুর্বোধ্য, বিশেষ করে এই সময়ে।
তার প্রশ্ন, এই নাটকীয় ও অপমানজনক পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার কী বার্তা দিতে চাইছে? যখন নতুন সরকার নিজেকে গোছাতে শুরু করেছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশাল কাঠামো কীভাবে কাজ করে তা শিখছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুনর্গঠন করছে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ দিচ্ছে—ঠিক এই মুহূর্তে গভর্নরকে অপসারণের প্রয়োজন কেন হলো? সরকার জেনেশুনে সরাসরি দলীয় এক কর্মীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যে নিয়োগ দিয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা কীভাবে করব?
শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি, প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তিনি মনে করেন, মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে 'প্রথম শ্রেণিতে পড়েন না'। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা দলের একজন শীর্ষ সদস্য হিসেবে গভর্নর পদ মোস্তাকুর রহমানের পুরস্কার।
'অ্যা কন্ট্রোভার্সিয়াল ডিসিশন' শিরোনামে আজ শুক্রবার (২৭শে ফেব্রুয়ারি) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটির লিংক ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট থেকে এর মধ্যে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে তার বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। অনেক নেটিজেন বলছেন, তারেক রহমান সরকারের যাত্রার পর এটিই মাহফুজ আনামের লেখা প্রথম কলাম।
নতুন সরকারের যাত্রালগ্নে লেখা প্রথম কলামেই মাহফুজ আনাম ক্ষোভ প্রকাশ করে সরকারের 'ব্যর্থতা' তুলে ধরেছেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন গত সরকারের আমলে দুর্নীতি, লুটপাট, মব সন্ত্রাস, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, গণমাধ্যম দলন, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলা দায়েরের মতো বিষয়গুলো নিয়ে শুরুতে চুপ ছিলেন তিনি। নানাভাবে তিনি ইউনূস সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। ইউনূস সরকারের ন্যূনতম সমালোচনা করার ক্ষেত্রে তিনি যতটা সময় দিয়েছেন, তারেক রহমান সরকারকে ততটা সময় তিনি হয়তো দেবেন না বলে নেটিজেনদের অভিমত।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মে মাসে সার্বিক পরিস্থিতির ব্যর্থতার কারণে ড. ইউনূস সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দেন। যদিও তার হুমকিকে জনগণের বিরাট অংশ আস্থায় নেয়নি। ওই সময়ে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার পত্রিকায় 'অভিমানী' সরকারপ্রধানের ‘মান ভাঙাতে’ কলাম লেখেন ‘প্লিজ ডোন্ট রিজাইন: অ্যাপিল টু প্রফেসর ইউনূস’।
এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- ‘দয়া করে পদত্যাগ করবেন না: ড. ইউনূসের প্রতি আবেদন’। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো সরকারপ্রধান, বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানকে নিয়ে এমন প্রশংসাযুক্ত ‘কলাম’ মাহফুজ আনামের মতো নামকরা ও প্রথম সারির কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক লিখেছেন বলে জানা যায় না।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ‘আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে নিজেকে তখন ঘোষণা দেন মাহফুজ আনাম। ২০২৫ সালের ১৮ই এপ্রিল ডেইলি স্টারে 'আনহেলদি ইলেকশন কন্ট্রুভার্সি মাস্ট বি রিসলভড' শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ দেশের আর কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কোনো সরকারের পক্ষে কলাম লিখে এভাবে ঘোষণা দেওয়ার নজির নেই।
এক এগারোর সেনা সমর্থিত জরুরি অবস্থার সরকারের আমলে মাহফুজ আনামের সম্পাদিত ডেইলি স্টার অশুভ শক্তির সরবরাহ করা সংবাদ যাচাই-বাছাই না করে ছাপিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করত বলে অভিযোগ আছে। একপর্যায়ে মাহফুজ আনাম বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে স্বীকার করেন, তিনি এক এগারোর সময় গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যে যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ ছেপে ভুল করেছিলেন।
একাধিক বিশেষজ্ঞ সুখবর ডটকমকে বলেন, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার জন্য অর্থনীতিতে বড় ডিগ্রি থাকা আবশ্যক নয়; আবশ্যক হলো তার বাস্তব অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, এবং সঠিক মানুষদের কথা শোনার ক্ষমতা। আর এই তিনটি জায়গাতেই একজন সফল ব্যবসায়ীর বিশেষ শক্তি থাকে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ২৫তম গভর্নর শক্তিকান্ত দাস ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র।
কোভিড মহামারির ভয়াবহ আঘাতে যখন ভারতের অর্থনীতি টলটলায়মান, তখন শক্তিকান্ত দাস মাত্র দুই মাসে রেপো রেট ১১৫ বেসিস পয়েন্ট কমালেন, ভারতের জিডিপির ৮.৭ শতাংশের সমান তারল্য বাজারে ছেড়ে দিলেন, এবং ব্যাংক ঋণে তিন মাসের মরিটোরিয়াম ঘোষণা করলেন এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন একজন মানুষ, যিনি নাকি 'অর্থনীতি বোঝেন না'।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরপর দুই বছর গ্লোবাল ফাইন্যান্স শক্তিকান্ত দাসকে বিশ্বের সেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে ‘এ প্লাস’ রেটিং দেয়। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে মোস্তাকুর রহমানের নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায় না, ভবিষ্যতই বলে দেবে এই পদে তার সফলতা-ব্যর্থতা। পাশাপাশি বলে দেবে তাকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কতটা সঠিক হয়েছে।
এদিকে আজ শুক্রবারের প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম লেখেন, অর্থনীতির প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, সে প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এই পদে যিনি আছেন (মোস্তাকুর রহমান), তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি, প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞানের প্রশ্নগুলো কি তার নিয়োগকে যথার্থতা দেয়? নতুন গভর্নর অন্য অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত হতে পারেন; কিন্তু এই পদে?
তিনি বলেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি অস্বস্তিকর তথ্য হলো—গত ডিসেম্বরেই তিনি নিজের ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। ঋণখেলাপি দুই ধরনের—ইচ্ছাকৃত এবং পরিস্থিতিগত। আমরা আশা করি তিনি প্রথম শ্রেণিতে পড়েন না। খেলাপি ঋণ আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যাধি এবং এটি সব ব্যাংকের কার্যক্রমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যিনি নিজেই একসময় ঋণখেলাপি ছিলেন, তিনি অন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি বলেন, আরেকটি প্রশ্ন গভর্নরের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিপুল সাফল্য এনে দেওয়া নির্বাচন পরিচালনা দলের একজন শীর্ষ সদস্য ছিলেন তিনি। তাহলে গভর্নরের পদ কি তার পুরস্কার? তাহলে সরকার জেনেশুনে সরাসরি দলীয় এক কর্মীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যে নিয়োগ দিয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা কীভাবে করব?
তিনি বলেন, সরকারপ্রধান ইতোমধ্যে যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, এ ধরনের আচরণ (অপসারণের পদ্ধতি) সেটির সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর যে মর্যাদাবোধ, সংযম ও স্থিরতা আমরা দেখি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে থাকা একজন ব্যক্তির অপমানজনকভাবে বিদায় নেওয়ার ঘটনায় এর ঠিক বিপরীত চিত্রই দেখা গেল।
তিনি লেখেন, এই পদক্ষেপের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে এই ধারণা থেকে যে, ‘মব’-এর কাছে নতি স্বীকার করে নেওয়া হলো। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সার্বিক মূল্যায়ন কিংবা এর প্রভাব নিয়ে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না, তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। এটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন কিছু কর্মকর্তা মূলত প্রশাসনিক দাবিদাওয়া নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন।
তার প্রশ্ন, নতুন সরকারের প্রথম দিককার অঙ্গীকারগুলোর একটি ছিল ‘মব’ বরদাশত না করা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যা ঘটেছে, তা কি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের পদক্ষেপকে উসকে দেবে না?
খবরটি শেয়ার করুন