ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার (২০শে ফেব্রুয়ারি) এক বিশেষ ঘোষণায় তিনি বিশ্বের সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ‘বৈশ্বিক শুল্ক’ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার ‘সুরক্ষাবাদী’ নীতির এক আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
২০শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে (৬-৩ ভোটে) প্রেসিডেন্টের আগের বিতর্কিত ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালত জানান, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন-এর দোহাই দিয়ে এভাবে ঢালাও শুল্ক বা কর বসাতে পারেন না। কারণ, কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। এই রায়ের ফলে গত বছর বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১৯-২০ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশের ওপর আরোপিত বিভিন্ন হারে বাড়তি শুল্কের আইনি ভিত্তি রাতারাতি ধসে পড়ে।
তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে নতুন প্রোক্লেমেশনে স্বাক্ষর করেন। এই ধারাটি প্রেসিডেন্টকে ‘বিরাট ও গুরুতর’ ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (লেনদেনের ভারসাম্য) সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাময়িক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই ১০ শতাংশ ‘অ্যাড ভ্যালোরম’ (পণ্যের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে) শুল্ক ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (ইএসটি) থেকে কার্যকর হবে। এটি প্রাথমিকভাবে ১৫০ দিন স্থায়ী হবে। মেয়াদ বাড়াতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) এই শুল্ক সংগ্রহ করবে।
তবে মার্কিন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে বেশ কিছু পণ্যকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ; জরুরি ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল; কৃষিপণ্য যেমন গরুর মাংস, টমেটো এবং কমলা; টেলিযোগাযোগ ও মহাকাশ গবেষণা সরঞ্জাম; বই ও অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত সামগ্রী।
প্রথমে বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ। সে সময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে সেই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত মতে পৌঁছাতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলতে থাকে। গত ৯ মাসে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষি শেষে উভয় পক্ষ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ।
চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করছে, সেটা পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশ কী কী কেনাকাটা ভবিষ্যতে বাড়াবে, সেটা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে ১৪টি।
১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫০০ কোটি ডলারের।
বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে ৩৫০ কোটি ডলারের।
আদালত ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল করায় বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যেমন:
১. শুল্কের হার হ্রাস ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়েছে। তবে চুক্তির ফলে আমদানিকৃত মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। যদিও অন্যান্য তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্ক ১৯ শতাংশই থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের হার বাতিল হওয়ায় এবং নতুন শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারিত হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য খরচ প্রায় অর্ধেক কমে আসবে। তবে অন্যান্য দেশের জন্যও একই হারে শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ায় ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২. আগের শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা: আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে অবৈধভাবে সংগৃহীত প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যদি গত এক বছরে কয়েক শ কোটি ডলার বাড়তি শুল্ক দিয়ে থাকেন, তবে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে; যা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে দেশের জন্য বড় উদ্দীপনা হতে পারে।
৩. পোশাক খাতের ঝুঁকি: হার কমলেও অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক মার্কিন বাজারে পণ্যের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দেবে। একটি ১০ ডলারের টি-শার্টের দাম ১১ ডলার হয়ে গেলে মার্কিন ক্রেতাদের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ৪৬ লাখ শ্রমিকের (যাদের ৮০ শতাংশ নারী) কর্মসংস্থান ও আয় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা রিসিপ্রোকাল শুল্ক চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। যেহেতু নতুন শুল্কের মেয়াদ মাত্র ১৫০ দিন, তাই এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে বিশেষ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
এ ছাড়া এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে বাংলাদেশকে। অর্থাৎ রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনয়ন ছাড়া এ ধরনের বাণিজ্য বাধা কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে ২৪শে ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববাণিজ্যে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, যার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে আগামী জুনে মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন