ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দেশে সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফরের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, সৌদি আরবের রিয়াদ, কাতারের দোহা, জাপানের টোকিও এবং তুরস্কের আনতালিয়া। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেওয়াকে এসব সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছে ঢাকা।
সফরের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রস্তাবিত পাঁচটি গন্তব্যই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে এসব দেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চায় সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়তে পারেন। সেখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নেবেন তিনি। ডেইলি সান জানিয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক যাত্রার প্রস্তুতি চলছে এবং তার সফরটি প্রায় নয় দিনের হতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ।
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি এবার অন্য সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে জাতিসংঘের আরও জোরালো সহযোগিতা চাইতে পারেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এবার আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক সফরের পাশাপাশি তুরস্কের আনতালিয়ায় কপ-৩১-এর বিশ্বনেতাদের সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর এই সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা জানিয়েছে সরকারের সূত্র। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কপ-৩১-এর মূল সম্মেলন আনতালিয়ায় ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
অন্য তিন দেশ—সৌদি আরব, কাতার ও জাপান সফরের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একটি রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সফরের তারিখ নির্ধারণের কাজ চলছে।
পরিকল্পিত এসব সফরের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতিরও মিল রয়েছে। ইশতেহারে উপসাগরীয়, মুসলিম ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার চীন সফর করেছেন। এবার সৌদি আরব, কাতার, জাপান ও তুরস্ক সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একটি রাজনৈতিক সূত্র বলেছে, বাংলাদেশ উপসাগরীয়, মুসলিম ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, জ্বালানি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত। ফলে পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও এসব সফরের অন্যতম চালিকা শক্তি।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব ইতিমধ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। গত জুলাইয়ে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দেওয়া আমন্ত্রণের কথা জানিয়েছিল দ্য ডেইলি স্টার। পরে ১৭ আগস্টও সৌদি পক্ষ প্রধানমন্ত্রীর সফরের আমন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করে। দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে সফরের তারিখ নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছিল।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করেন। তাদের পাঠানো প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সৌদি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আগ্রহও বাড়ছে। সৌদি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে বাংলাদেশে ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্স সম্প্রতি জানিয়েছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গঠিত নতুন ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ বিষয়ে আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। তবে এমন কোনো জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
কাতারের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের বড় ভিত্তি জ্বালানি ও শ্রমবাজার। বাংলাদেশ কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে। দেশটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। দোহার কাছ থেকে আরও বিনিয়োগ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকার।
জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও কাতারের গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে কাতারএনার্জি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেক করেছে। ফলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সেে আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারএনার্জি বাংলাদেশসহ এশিয়ার ক্রেতাদের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩৩টি চালান কিনেছে। এতে বোঝা যায়, কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু প্রবাসী শ্রমিক বা বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত।
জাপানও বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। মেট্রোরেল এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।
জাপানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে। গত জুলাইয়ে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। জাপানের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলার বিষয়টিও সেখানে আলোচনায় আসে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরব, জাপান ও কাতার বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন উন্নয়ন সহযোগী। দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। তাই এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। এর লক্ষ্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বৃত্ত পুঁজির সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা ও মানবসম্পদের সমন্বয় ঘটানো। খাদ্যনিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও সেখানে বলা হয়।
সরকারের সামনে এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার মতো বড় কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বৈদেশিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ কারণে পরিকল্পিত বিদেশ সফরগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছে না ঢাকা; বরং জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করা হচ্ছে।
আল জাজিরা সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছে, তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের পরিধি বহুমুখী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এই বাস্তবতায় নিউইয়র্ক ও আনতালিয়া সফরে বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। আর রিয়াদ, দোহা ও টোকিও সফরের মূল গুরুত্ব থাকবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শ্রমবাজার ও উন্নয়ন সহযোগিতায়। পাঁচ দেশের সফর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির সমন্বয় কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
খবরটি শেয়ার করুন