দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ সংকট ঘিরে নানা বিতর্ক ও উত্তেজনার মধ্যে পত্রিকাটির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইসরাফিল ফরাজী একটি ভিডিওবার্তায় তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
গতকাল সোমবার (৪ঠা আগস্ট) তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সম্পাদক শামীমা এ খানের কিছু দাবিকে ‘মিথ্যাচার’ আখ্যা দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। ফরাজীর ভিডিওটি এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (৫ই আগস্ট, মঙ্গলবার) ৩,৭০০ বার দেখা হয়েছে। এতে ৫০০ রিঅ্যাকশন ও ৩২টি মন্তব্য ছিল।
ইসরাফিল ফরাজী বলেন, ভাইরাল হওয়া অডিওতে সম্পাদক শামীমা এ খান দাবি করেছেন, পত্রিকার ফটোকার্ডের রং পরিবর্তন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক ফরাজীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের নির্দেশ এসেছিল শামীমা এ খানের ছোট ছেলে জিসাল আতিকুল্লাহ খানের পক্ষ থেকে। তিনি জিসালকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের একটি ঘটনায় জিসাল এক কর্মচারীকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন এবং পরে প্রভাব খাটিয়ে মামলা নিতে বাধা দেন। সেই কর্মচারী বর্তমানে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান ফরাজী।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত দুই সপ্তাহে জনকণ্ঠ নিউজ পোর্টালের দায়িত্বে থাকাকালে জিসাল খান মাঝরাতে কর্মীদের ফোন করে নিউজ আপডেট দিতে বাধ্য করতেন। নারী সহকর্মীদের সাথেও তিনি অশালীন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাসুদ কামালের সমালোচনায় ইসরাফিল ফরাজী
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল সম্প্রতি এই সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ‘টার্মিনেশন লেটার’ দিয়েছে, যা আইনি দিক থেকে বৈধ। এর জবাবে ফরাজী বলেন, ‘জনকণ্ঠের নিয়ম অনুযায়ী ৬ মাসের শিক্ষানবিশ (প্রবেশন) পিরিয়ডের পর কর্মীরা অটোমেটিকভাবে স্থায়ী হয়ে যান। আমাকে চাকরিচ্যুত করতে হলে তিন মাস আগে নোটিশ দিতে হতো এবং তিন মাসের বেতন দিয়ে বিদায় করতে হতো। এসব নিয়ম মানা হয়নি।’
এছাড়াও মাসুদ কামাল অভিযোগ করেন, বর্তমান সম্পাদকের নাম প্রিন্টার্স লাইনে দেখা যাচ্ছে না। ফরাজী এই অভিযোগের প্রতিবাদ করে বলেন, ‘প্রিন্ট লাইনেই উল্লেখ আছে—জনকণ্ঠ লিমিটেডের পক্ষে শামীমা এ খান কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত। অনলাইন ভার্সনে সম্পাদকীয় বোর্ডের নাম উল্লেখ করাটাই প্রচলিত এবং স্বাভাবিক।’
সম্পাদকীয় বোর্ড গঠন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমান সংকটে জনকণ্ঠের সাংবাদিক ও কর্মীরা এক হয়ে একটি ‘সম্পাদকীয় বোর্ড’ গঠন করেছেন বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়। গত ২রা আগস্ট রাতে গঠিত এ বোর্ডে ৬ সদস্য আছেন, যারা শুধু নিউজ কন্টেন্ট ও নীতিমালার দায়িত্বে থাকবেন। আর্থিক লেনদেনের কোনো বিষয়ে তারা জড়িত থাকবেন না বলেও নিশ্চিত করেন ফরাজী।
তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা সাড়া দেননি বা অফিসে আসেননি। সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতায় এই সংকট নিরসনের জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রতারণা ও পাওনা আদায়ের অভিযোগ
ফরাজী অভিযোগ করেন, জনকণ্ঠ প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণে জর্জরিত। সাংবাদিকদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৪.৫ কোটি টাকা। ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী এবং অন্যান্য পক্ষের বকেয়া টাকাও বিপুল অঙ্কের।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি নিরসনে একজন প্রশাসক নিযুক্ত করে তদন্ত ও পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।’
আইনি পদক্ষেপ ও নিরাপত্তা দাবি
ইসরাফিল ফরাজী আরও জানান, জনকণ্ঠ পরিবারের বিরুদ্ধে ১৫ জনকে আসামি করে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, মামলার আসামিদের যেন দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হয়।
খবরটি শেয়ার করুন