ছবি: সংগৃহীত
আজ ৭ই জানুয়ারি, ২০২৬। যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নতুন বছর বরণে ব্যস্ত, তখন পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে আরব বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি খ্রিষ্টান পালন করছেন পবিত্র বড়দিন। ফিলিস্তিন, মিসর, রাশিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো দেশে আজ উৎসবের আমেজ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিশুখ্রিষ্টের জন্ম যেখানে ২৫শে ডিসেম্বর বলে পরিচিত, সেখানে কেন এই বিরাট জনগোষ্ঠী আজ বড়দিন পালন করছে? পার্থক্যটি জন্ম তারিখ নিয়ে নয়, ক্যালেন্ডার নিয়ে। বড়দিনের এই তারিখের পার্থক্যের কারণ কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা নয়, বরং এটি একটি গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানগত বিষয়। তথ্যসূত্র: বিবিসি ও এএফপি।
এর মূলে রয়েছে দুটি ক্যালেন্ডার—জুলিয়ান ও গ্রেগরিয়ান। এই বিভাজনের সূত্রপাত ১৫৮২ সালে। সে বছর ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ একটি নতুন ক্যালেন্ডার চালুর নির্দেশ দেন, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। এটি চালু করা হয় পুরোনো ও কম নির্ভুল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। তবে এতে সৌর বছরের দৈর্ঘ্য ১১ মিনিট বেশি ধরা হয়েছিল। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋতু ও তারিখের মধ্যে গরমিল তৈরি হতে থাকে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি ১২৮ বছরে এক দিন করে পিছিয়ে পড়া হয়। অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এক দিন পেছাতে সময় লাগে ৩ হাজার ২৩৬ বছর। তাই এটি সৌর বছরের অনেক বেশি নির্ভুল হিসাব দেয়।
এই পার্থক্য সামাল দিতে ১৬ শতকে হঠাৎ করেই ১০ দিন বাদ দেওয়া হয়, যাতে ক্যালেন্ডার (গ্রেগরিয়ান) আবার প্রকৃত সময়ের সঙ্গে মিলতে পারে। তবে সে সময় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও অনেক অর্থোডক্স ও প্রাচ্য খ্রিষ্টান গির্জা তাদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারই ব্যবহার করে আসছে।
বর্তমানে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে। ফলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫শে ডিসেম্বর আমাদের বর্তমান ক্যালেন্ডারে পড়ে ৭ই জানুয়ারি।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২১০১ সালে অর্থোডক্স বড়দিন ৮ই জানুয়ারিতে হবে, কারণ, তখন দুই ক্যালেন্ডারের ব্যবধান বেড়ে ১৪ দিনে পৌঁছাবে।
বিশ্বে আনুমানিক ২৩০ কোটি খ্রিষ্টানের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন পালন করেন। এর মধ্যে রয়েছেন—প্রায় ১৩০ কোটি ক্যাথলিক, ৯০ কোটি প্রোটেস্ট্যান্ট এবং কিছু অর্থোডক্স খ্রিষ্টান, যারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেছেন।
বাকি ২৫ থেকে ৩০ কোটি খ্রিষ্টান মূলত অর্থোডক্স ও কপটিক সম্প্রদায়—৭ই জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন। দিনটি ‘ওল্ড ক্রিসমাস ডে’ নামেও পরিচিত।
৭ই জানুয়ারি বড়দিন পালনকারী উল্লেখযোগ্য গির্জাগুলোর মধ্যে রয়েছে—রুশ অর্থোডক্স চার্চ (সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী), সার্বিয়ান ও জর্জিয়ান অর্থোডক্স চার্চ, কপটিক অর্থোডক্স চার্চ (মিসর), ইথিওপিয়ান ও ইরিত্রিয়ান অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চ।
ইউক্রেনে ঐতিহ্যগতভাবে বড়দিন পালিত হতো ৭ই জানুয়ারি। তবে ২০২৩ সালে দেশটির সরকার পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ২৫শে ডিসেম্বরকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। যদিও এখনো অনেক মানুষ ৭ই জানুয়ারিই বড়দিন পালন করেন।
গ্রিস, রোমানিয়াসহ কয়েকটি অর্থোডক্সপ্রধান দেশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। বুলগেরিয়া ১৯৬৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিবর্তন করে।
বেলারুশ ও মলদোভায় ২৫শে ডিসেম্বর ও ৭ই জানুয়ারি—দুই দিনই জাতীয় ছুটি। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং ইরিত্রিয়ার কিছু অঞ্চলেও দুই দিনেই ছুটি থাকে।
খবরটি শেয়ার করুন