বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বন্ধ হতে পারে দেশে ৬ কোটি বাটন ফোন *** প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিদায় *** আলজেরিয়া সফরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির *** এল ক্লাসিকোর আগে চোটের মিছিলে ওলমোও, দুশ্চিন্তা বাড়ল বার্সার *** সাজেকে কাল থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ *** চট্টগ্রামে হিন্দু তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২ *** ২৫ অক্টোবর থেকে রিয়াদে ফ্লাইট শুরু করবে বিমান *** ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগান যে কারণে ‘বিসমিল্লাহ’ *** রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পিঁয়াজু, জুসসহ খাবারের ব্যবসা করতেও নিবন্ধন নিতে হবে, আপত্তি ব্যবসায়ীদের *** আবার চালু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি, বাংলাদেশিরা কী আবেদন করতে পারবেন

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগান যে কারণে ‘বিসমিল্লাহ’

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৭:৪৫ অপরাহ্ন, ২১শে অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এখন একটি অদ্ভুত স্লোগান ঘুরছে। ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। কথাটির সরাসরি কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। আরবি ভাষার ধর্মীয় অভিব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ফরাসি শব্দগুচ্ছ ‘সে লে তেনেব্র’ মিলিয়ে তৈরি এই বাক্য এখন দেশটির তরুণদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্লোগানটি দিয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু সরকারের শিক্ষানীতির সমালোচনা করছেন না, পুলিশের নজরদারি এবং আরব ও আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত তরুণদের সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণবাদী ধারণাকেও ব্যঙ্গ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত অনলাইন আলোচনাগোষ্ঠীতে প্রবেশের চেষ্টা করা এক ব্যক্তির বার্তা থেকে স্লোগানটির সূত্রপাত বলে ধারণা করা হয়। পরে সেই বার্তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা সেটিকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রার্থনাবাক্য ‘আল্লাহর নামে শুরু’ এবং ফরাসি বাক্যাংশ ‘এ তো অন্ধকার’—এর মিশ্রণে তৈরি এই বাক্যের বাহ্যিক কোনো অর্থ হয়তো তেমন পাওয়া যাবে না।

ফরাসি ভাষায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে আল্লাহর নামে শুরু করাকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘সে লে তেনেব্র’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘এ তো অন্ধকার’। দুটি অভিব্যক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করলে অর্থপূর্ণ কোনো বাক্য তৈরি হয় না। বরং তরুণদের ভাষা অনুকরণ করতে গিয়ে কেউ অস্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন, এমন ধারণা তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের কাছে এই অস্বাভাবিকতাই স্লোগানটির হাস্যরসের প্রধান উৎস।

ইউরোপভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অক্টোবরের শুরুতে স্ন্যাপচ্যাটে একটি বার্তার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর স্লোগানটি আলোচনায় আসে। ওই বার্তায় ‘মামাদু’ নাম ব্যবহার করা একজন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসংক্রান্ত ব্যক্তিগত আলোচনাগোষ্ঠীতে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানান। বার্তায় আরবি অভিব্যক্তি, ফরাসি তরুণদের কথ্য ভাষা এবং আলজেরিয়ার পতাকার প্রতীকও ছিল।

বার্তাটিতে আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি সবকিছু ভেঙে ফেলার কথাও বলা হয়েছিল। এমন ভাষা দেখে অনেক শিক্ষার্থীর সন্দেহ হয়, কোনো ব্যক্তি তাদের মতো তরুণ সেজে আন্দোলনের গোপন পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা, ওই ব্যক্তি পুলিশের ছদ্মবেশী সদস্য হতে পারেন।

তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। নিউইয়র্ক টাইমসও বার্তাগুলোর মূল উৎস নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে এগুলো পুলিশের কোনো কর্মকর্তার পাঠানো কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্দিষ্ট বার্তাগুলো সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, অপরাধের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের যোগাযোগ শনাক্ত করতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, পুলিশের এমন কৌশল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আলোচিত বার্তাগুলোর সঙ্গে পুলিশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই স্লোগানটি আন্দোলনকারীদের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে। তারা মনে করছেন, তাদের কথাবার্তা ও আচরণ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। বিশেষ করে আরব ও আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত তরুণদের ভাষা এবং পরিচয়কে যেভাবে দেখা হয়, আলোচিত বার্তাটি তার একটি ব্যঙ্গাত্মক উদাহরণ।

আল জাজিরা আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্লোগানটি শিক্ষার্থীদের কাছে পুলিশের অনুপ্রবেশের অভিযোগকে উপহাস করার পাশাপাশি বর্ণগত পূর্বধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। প্যারিসের অষ্টম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় সমাজবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ইউসুফ এল চাজলি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, এ ধরনের ভাষা এমন এক পুলিশের ছবি তুলে ধরে, যারা তরুণদের বাস্তব জীবন ও ভাষা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখে না এবং প্রচলিত ছকে তাদের বিচার করে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ধারণা আরব ও আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত তরুণদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ থেকে আসা পরিবারগুলোর সন্তানদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পুলিশি আচরণ, বৈষম্য এবং সামাজিক সুযোগের অসমতা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে।

শিক্ষার্থীদের কাছে তাই স্লোগানটি কেবল হাসিঠাট্টার বিষয় নয়। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইছেন, তাদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা হলেও তারা তা শনাক্ত করতে পারেন। পাশাপাশি নিজেদের ভাষা ও রসবোধ ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেও তারা সক্ষম।

ফ্রান্সের প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচের বক্তব্যও এই বিষয়টি স্পষ্ট করে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, কোনো তরুণ এভাবে কথা বলেন না। শিক্ষার্থীরা স্লোগানটিকে নিজেদের করে নিয়েছেন এটা বোঝাতে যে তাদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাদের চোখ এড়ায় না।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদির মতে, আলোচিত বার্তাগুলোতে আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে আগে থেকেই একটি ধারণা তৈরি করে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কে ব্যারিকেড তৈরি করছেন, কে ভাঙচুরে যুক্ত হতে পারেন, তা যেন তাদের পরিচয় দেখেই অনুমান করা হচ্ছে। প্যারিসের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেনও স্লোগানটিকে তরুণদের ভাষার বাজে অনুকরণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ভাঙচুরের সঙ্গে আরব পরিচয়কে এক করে দেখার প্রবণতাও এতে প্রকাশ পেয়েছে।

ফ্রান্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্লোগানটি ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোনিউজ জানিয়েছে, বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশের তরুণদের বিক্ষোভেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিভি ফাইভ মঁদ এক প্রতিবেদনে বলেছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। ভিডিওতে তিনি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় কিছু অঙ্গভঙ্গিও ব্যবহার করেন। এতে স্লোগানটির পরিচিতি আরও বাড়ে।

এর সঙ্গে ভারতের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী হাস্যরসেরও মিল রয়েছে। সেখানে তরুণদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের জবাবে প্রতিবাদকারীরা সেই শব্দকেই নিজেদের আন্দোলনের পরিচিতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ফ্রান্সেও একটি কথিত অনুপ্রবেশকারী বার্তার ভাষাকে উল্টো প্রতিবাদের হাতিয়ার বানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ থেকে। জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং অতিরিক্ত চাপের সময়সূচি পরিবর্তনের দাবি জানান তারা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেন। ওই সময় পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। আন্দোলন ঘিরে ছয় হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তারের কথাও জানানো হয়।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দেশটির চার শ থেকে পাঁচ শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে পাঠদান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

পরে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার অবনতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিক্ষোভ যুক্ত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে।

ফলে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অদ্ভুত বাক্য নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ। আন্দোলনকারীরা স্লোগানটিকে ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষের কথিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা নিয়ে ঠাট্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা দেখাচ্ছেন, তাদের প্রতিবাদের ভাষা শুধু দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যঙ্গ, রসিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তাদের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে স্লোগানটির উৎপত্তি নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আলোচিত বার্তাগুলো পুলিশের কোনো সদস্য পাঠিয়েছিলেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগ ও নিশ্চিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। কিন্তু উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও স্লোগানটি ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে যে পরিচিতি পেয়েছে, তা স্পষ্ট। তাদের কাছে এটি এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা নিজেদের ভাষায় কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে এবং নিজেদের সম্পর্কে তৈরি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে।

ফ্রান্স

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250