ছবি: সংগৃহীত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজারে প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়া এবং দুই কর্মীকে আটকে রাখার ঘটনা দেশে মব–সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে এর বিক্রি বন্ধের চাপ দেওয়া হয়। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় দুই কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সরকার বা আদালত আইনগতভাবে কোনো বই নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত সেটি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন নেই।
এ ঘটনাকে জনতার আবেগের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, জনজীবনে মব–সংস্কৃতি কখনো প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে প্রকাশ পেলেও কখনো তা অন্ধ প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর মধ্য দিয়ে সমাজের অন্তর্গত ভয়, ক্ষোভ, ন্যায়বিচারের অভাব ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার প্রকাশ ঘটে।
দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘মব–সংস্কৃতি: ক্ষোভের প্রকাশ, নাকি সংগঠিত সন্ত্রাস’ শিরোনামের কলামে এসব কথা লিখেছেন মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি মনে করেন, জনতার শক্তি নিজে থেকে সব সময় ইতিবাচক বা নেতিবাচক নয়। কোন পরিস্থিতিতে, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে সেই শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপরই এর চরিত্র নির্ভর করে।
দেশের ইতিহাসে জনতার ঐক্যের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষায়, স্বাধীনতার জন্য গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ একত্র হয়েছিল। সেই সময় জনতার শক্তি ছিল মুক্তির শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও সামাজিক বৈষম্য জনতার ক্ষোভকে অন্য পথে পরিচালিত করেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে খাদ্যগুদামে ক্ষুধার্ত মানুষের আক্রমণের ঘটনাকেও তিনি জনতার ক্ষোভের ঐতিহাসিক প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণে, জনতার মধ্যে সমষ্টিগত আবেগ এমনভাবে কাজ করতে পারে, যাতে ব্যক্তি নিজের স্বাভাবিক বিচারবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি ফরাসি চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বঁ-এর ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’ বইয়ের ধারণা উল্লেখ করেছেন। লে বঁ-এর ব্যাখ্যায়, জনতার মধ্যে ব্যক্তির যুক্তির চেয়ে আবেগ প্রাধান্য পেতে পারে। তবে এ ধারণা জনতার সব আচরণ ব্যাখ্যা করে না; বরং দলবদ্ধ অবস্থায় মানুষের আচরণ পরিবর্তনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ বা ব্যক্তিসত্তা লোপের ধারণাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, জনতার মধ্যে ব্যক্তি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও কাজের দায় সম্পর্কে সচেতনতা হারাতে পারেন। ফলে একা থাকলে যে আচরণ করতেন না, দলবদ্ধ অবস্থায় তাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিচয়ের বোধ দুর্বল হওয়া, আবেগের আধিপত্য এবং ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সহিংসতার পথ তৈরি করতে পারে।
দেশে গুজবের ভিত্তিতে কাউকে চোর বা ছিনতাইকারী সন্দেহ করে পিটিয়ে হত্যা, রাজনৈতিক মিছিলে ভাঙচুর কিংবা খেলার মাঠে দর্শকদের সহিংস হয়ে ওঠার মতো ঘটনাকে এ প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, বিচারহীনতা মব–সংস্কৃতির অন্যতম কারণ। মানুষ যখন মনে করে, অপরাধের বিচার হবে না, তখন কেউ কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় উৎসাহিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়লে এমন পরিস্থিতিতে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতে পারে।
গ্রামীণ সমাজেও এ প্রবণতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। চোর সন্দেহে নিরপরাধ মানুষকে মারধর বা হত্যার ঘটনা তার উদাহরণ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পল্লী–সমাজ’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে মহিউদ্দিন আহমদ দেখিয়েছেন, গ্রামীণ সমাজে জনতার আবেগ কীভাবে একজন ব্যক্তির জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে। তার বক্তব্যে, মব–সংস্কৃতি কেবল শহরের কোনো সাম্প্রতিক সমস্যা নয়; এর শিকড় সমাজের পুরোনো বিচারহীনতা, গুজব ও সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে।
২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। গুজবের ভিত্তিতে নিরপরাধ মানুষকে আক্রমণের এসব ঘটনা দেখিয়েছে, জনতার মধ্যে আতঙ্ক ও সন্দেহ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কত দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আবার ধর্ষণ বা হত্যার মতো অপরাধের ঘটনায় বিচারের অপেক্ষা না করে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর হামলা চালানোর প্রবণতাও দেখা যায়। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, জনতার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পথে পরিচালনা করা না গেলে তা নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটিও মব–সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। গত ৪ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ৯ অক্টোবর তিন ছাত্রদল নেতার ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের খবর প্রকাশিত হয়।
মহিউদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সংঘর্ষ ও মব–সন্ত্রাসের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তার বিশ্লেষণে, দুটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী সংগঠিতভাবে মুখোমুখি হলে এবং ক্ষমতা বা প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়ালে সেটি রাজনৈতিক সহিংসতা। অন্যদিকে, গুজব, ক্ষোভ বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তা মব–সন্ত্রাসের রূপ নিতে পারে। তবে রাজনৈতিক গোষ্ঠীও কখনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জনতাকে উসকে দিতে পারে। ফলে কোনো ঘটনায় জনতার উপস্থিতি থাকলেই সেটিকে স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ বলে ধরে নেওয়া যায় না; ঘটনার পেছনের সংগঠন, উদ্দেশ্য ও নেতৃত্বও বিবেচনায় নিতে হয়।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আলোচনায় আসা ‘প্রেশার গ্রুপ’ বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, কোনো গোষ্ঠী সংগঠিতভাবে দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সেই চাপ প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহিংসতায় রূপ নিলে তাকে আর স্বাভাবিক আন্দোলনের পর্যায়ে রাখা যায় না। মব–সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ধারণা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। তার বক্তব্যে, যে পক্ষই হোক, রাজনৈতিক অবস্থান কোনো গোষ্ঠীকে সহিংসতার দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগও অনেক সময় মব–সহিংসতার উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো লেখা বা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির ওপর কিংবা ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনা এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের পরিবর্তে জনতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একইভাবে, কোনো বই বা প্রকাশনার বিষয়ে আপত্তি থাকলেও তা মোকাবিলার পথ হতে পারে আলোচনা, প্রতিবাদ কিংবা আইনি পদক্ষেপ; জোর করে বিক্রি বন্ধ করা বা কর্মীদের আটকে রাখা নয়।
মহিউদ্দিন আহমদ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে বাংলাবাজারের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে দেখিয়েছেন, বইটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সেটিকে যুক্তি ও আলোচনার বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। তার কলামে ঘটনাস্থলের দৃশ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। তবে তার মূল বক্তব্য হলো, বইয়ের বিষয়ে কারও আপত্তি থাকলেই জনতার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার চলে যায় না। কোনো বই নিষিদ্ধ কি না, সে বিষয়ে আইনগত অবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ।
মব–সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, জনসচেতনতা, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম এবং শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, গুজব যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া, অপরাধের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য ধরে নেওয়া এবং জনতার আবেগকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া—এসব প্রবণতা প্রতিরোধ করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে কেউ বিচার পাওয়ার জন্য আইনবহির্ভূত পথ বেছে নেওয়াকে সমাধান বলে মনে না করে।
জনতার শক্তি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারে। কিন্তু সেই শক্তি যখন ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নেয়, গুজবের ভিত্তিতে শাস্তি দেয় কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতায় ব্যবহৃত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণে, দেশের মব–সংস্কৃতি সমাজের গভীর ক্ষতকে প্রকাশ করছে। জনতার শক্তিকে গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত পথে পরিচালিত করা গেলে তা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হতে পারে; আর অন্ধ প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে উঠলে সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন