ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সময় তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি দল থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশের সাবেক কূটনীতিকদের নিয়ে এমন একটি প্রতিনিধিদল গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউ দিল্লি পোস্ট। আজ মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটির লেখক দিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী।
নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পর্যবেক্ষক দলে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা আগে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি এখনো একটি প্রস্তাব ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে; কবে এবং কীভাবে এমন কোনো দল বাংলাদেশে আসবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা পিটার ফারেনহোল্টজ। সেই বৈঠকে শেখ হাসিনা ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিলে তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি দল পাঠানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। ফারেনহোল্টজই একদল কূটনীতিককে তার সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ উদ্যোগের সঙ্গে জার্মান সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে স্পষ্ট করেছেন ফারেনহোল্টজ। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হিসেবে তিনি ব্যক্তিগত সক্ষমতায় এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পারেন—এমন অবস্থানের কথাই তিনি জানিয়েছেন। ফলে তার প্রস্তাবকে জার্মান সরকারের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ইউরোপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ওন্দ্রেই দস্তালকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নথিতেও তার নাম ওন্দ্রেই দস্তাল হিসেবে রয়েছে।
নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ফারেনহোল্টজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব বৈধ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরোধিতাও করেছেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ, ভারত ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে। এর শুরুতে শেখ হাসিনা নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। ১০ জুলাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। তিনি গ্রেপ্তার বা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
এরপর ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনা আবারও দেশে ফেরার কথা বলেন। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের সাজা মাথায় নিয়েই দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি শুধু তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ এবং তার বিরুদ্ধে চলা বিচারিক প্রক্রিয়াও যুক্ত হয়ে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে বলেছিল, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসংক্রান্ত যেকোনো বিষয় আইনগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। মঙ্গলবারই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেছেন, সরকার শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার অপেক্ষায় নেই; বরং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। সচিবালয়ে সরকারের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি ভারতকে চাপ দেওয়ার কৌশল নয়। সরকারের অবস্থান হলো, তিনি নিজে ফিরুন অথবা সরকার তাকে ফিরিয়ে আনুক—তাকে বাংলাদেশে ফিরতে হবে।
সরকারের এই অবস্থানের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘোষিত পরিকল্পনার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি নিজেই দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। আর সরকার বলছে, তিনি দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং তাকে ফেরানোর জন্য বাংলাদেশ ভারতকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস আজ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরে জানিয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তার বিরুদ্ধে সাজা হয়ে যাওয়ার পর স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের আইনি সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা ক্ষমতায় ফিরে যাওয়ার জন্য নয়; বরং দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। একই সাক্ষাৎকারে তিনি তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে যুক্ত করার সমালোচনা করেন।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। ২১ আগস্টের এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত অন্যদের প্রত্যর্পণের অনুরোধের জবাবের অপেক্ষার কথাও বলা হয়েছিল।
এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়ে দেশে ফেরার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এল। নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে ফারেনহোল্টজের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করলে যুক্তরাষ্ট্রও সে অনুযায়ী বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অবস্থান বিবেচনা করতে পারে। তবে এটি তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে এটিকে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ফারেনহোল্টজ বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত থাকার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করেছিলেন। নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে তার বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম সম্পর্কে আগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জার্মানির প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দেশটির অর্ডার অব মেরিট পদক পেয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে মুম্বাইয়ে জার্মান কনস্যুলেটেও দায়িত্ব পালনের তথ্য বিভিন্ন জীবনীসূত্রে পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন তিনটি সমান্তরাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। একদিকে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার অবস্থান জানাচ্ছে এবং ভারতকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করছে। এর পাশাপাশি তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা সাবেক কূটনীতিকদের সঙ্গে রাখার একটি প্রস্তাব সামনে এসেছে। তবে এই পর্যবেক্ষক দল শেষ পর্যন্ত গঠিত হবে কি না, কারা এতে থাকবেন এবং বাংলাদেশ সরকার বা অন্য কোনো দেশের সরকার এ উদ্যোগকে কীভাবে দেখবে—এসব প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত।
নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার আরও কয়েকজন বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। ফলে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে—এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে তার দেশে ফেরার বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দেশের আইনগত প্রক্রিয়া, ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন