আকস্মিক বণ্যার পর নেপালের একটি বিধ্বস্ত এলাকার ছবি। ছবি: এএফপি
প্রাণঘাতী বন্যায় নেপাল বিপর্যস্ত। পেরিয়ে গেছে দুই সপ্তাহ। নিখোঁজদের সন্ধান এখনো চলছে। নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে তথ্য জানতে এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানাতে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু তাদের কেউ কেউ সেখানে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হয়েছেন।
নিখোঁজ এক ব্যক্তির বোন বিবিসিকে বলেছিলেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম খুব ধীরগতিতে চলছে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সরকার যদি সময়মতো উদ্ধারকাজে বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মোতায়েন করত, তাহলে কি আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের অবস্থা আরও আগে জানতে পারতাম না?
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো আশা করি, তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যাবে।’
কয়েক দিন পর বিবিসিকে তিনি জানান, উদ্ধারকাজ নিয়ে সমালোচনা করায় তিনি ‘অনেক বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য’ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমনিতেই অনেক কষ্টের মধ্যে আছি। এর সঙ্গে এসব মন্তব্য আমাদের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
আরেক ঘটনায় এক তরুণী তার স্বামীকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ‘তৎপরতার অভাব’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অনলাইনে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী এখন নিখোঁজ। সরকার যদি তাকে খুঁজে না পায়, তাহলে অন্তত তার মরদেহটা কি আমাকে দেখাতে পারে?’
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সেটিকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপমানজনক মন্তব্য করা হয়।
একটি মন্তব্যে ওই তরুণীকে ‘নদীতে ঝাঁপ দিয়ে’ নিজেই অনুসন্ধানকাজে সহায়তা করার কথা বলা হয়। আরেকটি মন্তব্যে লেখা হয়, ‘সরকারকে দোষ দিলেই সবকিছু হয়ে যায় না।’
তবে অনেকে এসব অসংবেদনশীল মন্তব্যের সমালোচনাও করেছেন। একটি মন্তব্যে বলা হয়, ‘এ সময় ভুক্তভোগীকে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত, অভিশাপ দেওয়া নয়।’
এ পরিস্থিতিতে অনলাইনে নেতিবাচক মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে নেপাল সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সতর্ক করে বলেছেন, যারা দুর্ভোগে থাকা মানুষদের ‘হেয়’ করেন, তাদের প্রতি কর্তৃপক্ষ ‘কোনো ধরনের ছাড় দেবে না’।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শাহ লিখেছেন, ‘এই সংবেদনশীল সময়ে যারা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করেন, কষ্টে থাকা মানুষদের হেয় করেন কিংবা তাদের আরও কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন, তারা অপরাধী।’
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, এসব মন্তব্য কোথা থেকে করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মন্তব্যকারীদের ঠিকানা ও ফোন নম্বর শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইনে করা এসব মন্তব্য তদন্তে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দেশটির ইলেকট্রনিক লেনদেন আইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে মানহানি বা হয়রানি করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ রুপি (৬৬২ মার্কিন ডলার বা ৪৯০ পাউন্ড) জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
নেপালভিত্তিক নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা বডি অ্যান্ড ডেটার নির্বাহী পরিচালক দোভান রাই বলেন, কিছু অসংবেদনশীল মন্তব্য এমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আসতে পারে, যারা ‘রেজ বেইটিং’-এ জড়িত।
রেজ বেইটিং বলতে এমন নেতিবাচক বিষয়বস্তু তৈরি করাকে বোঝায়, যা মানুষের ক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা মানুষকে কোনো পোস্টে ক্লিক কিংবা সেটি শেয়ার করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়।
এসব মন্তব্য ‘সরকারের কট্টর সমর্থকদের’ কাছ থেকেও আসতে পারে বলে মনে করেন দোভান রাই। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘সরকারের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এমন একধরনের চরমপন্থাও রয়েছে, যারা সরকারকে প্রশ্ন করে এমন ব্যক্তিদের নিন্দা করে। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা আরও বিভক্ত হয়ে পড়েছে।’
খবরটি শেয়ার করুন