ছবি: সংগৃহীত
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকে মূলধারায় আসতে দেওয়া হয়নি বলে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দাবি করেন ওই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, ‘সমাজে একটি শক্তি সব সময় নারীর সমান অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সেই শক্তির একটি অংশ রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকতে পারে। তবে আমাদের কাজ ছিল যাতে তারা মূলধারায় আসতে না পারে এবং আমরা সেই কাজটা করতে পেরেছি।’
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান-এর বিশেষ আয়োজন ‘মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নয়ন আদিত্যর সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এই বক্তব্যের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে 'জামায়াতি দালাল, মুসলিম লিগের রাজাকারকন্যা' রিজওয়ানা হাসান সম্পর্কে আমার আলোচনা করার আর রুচি নেই বলে মন্তব্য করেন বিএনপির নেতা ও বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর। সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে আলোচনায় মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর বলেন, রিজওয়ানা হাসানের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটা হচ্ছে ড. ইউনূসদের মহলে কেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির মতো হয়ে উঠলেন? রিজওয়ানা হাসানের বাবা সৈয়দ মহিবুল হাসান মুসলিম লিগের রাজনীতি করতেন।
তিনি বলেন, ১৯৬৫ সালে এমপি হয়েছিলেন, মানে প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির মেম্বার হয়েছিলেন। তারপরে তিনি ১৯৭০ সালে ফেল করেন। ১৯৭৯ সালে স্বতন্ত্র থেকে পাস করেন এবং এরপরে স্বতন্ত্র পাস করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে হয়ে যান প্রতিমন্ত্রী, জনশক্তি প্রতিমন্ত্রী।
মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর বলেন, তারপর এরশাদের দলে যোগ দেন। এই কারণে সব ঘাটের পানি খাওয়া লোকের কন্যা হিসেবে সব ঘাটেরই মোটামুটি একটা সমর্থন রিজওয়ানার প্রতি ছিল। এটা হল বাস্তবতা।
তিনি বলেন, একজন সচিব আমাকে বলছেন, রিজওয়ানার সঙ্গে তিন মাস চাকরি করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমার ৩৬ বছর পার করেছে। প্রতিদিন ধমকাতেন। বলতেন যে মানসিকভাবে প্রস্তুত হন, জামায়াত আসছে ক্ষমতায়, এভাবে চলবে না।
তিনি আরো বলেন, তার সঙ্গে একটা মন্ত্রণালয়ে কাজ করা একজন সচিবের রেফারেন্স দিয়ে বলছি, রিজওয়ানা অন্তত ২৩টি জামায়াতি ঘরানার লোককে এই মিডিয়া দিয়ে গেছেন। উনি শেষ যে সই করেছেন, তা করেছেন ৩১শে জানুয়ারি দিয়ে, আর তার উপরে যিনি সই করেছেন তার ওই সইটা হচ্ছে ৯ই ফেব্রুয়ারি।
তিনি বলেন, মানে, কী পরিমাণ অসততা! রিজওয়ানা ‘বেলা’র নামে ধান্দাবাজি করেছেন, যত ভূমিদস্যু আছেন, তাদের ছাড় দিয়েছেন। আর যারা একটু গরিব মানুষ, টাকা পয়সা দিতে পারেনি, তাদের সুবিধা দিয়েছেন। এর নাম হচ্ছে রিজওয়ানা হাসান।
প্রসঙ্গত, সাংবাদিক নয়ন আদিত্যর সঙ্গে আলাপকালে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশজুড়ে নানা ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। সে সময় মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে কটূক্তির মতো ঘটনাও সামনে আসে। ৫ই আগস্টের পর পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই চাপের ছিল। একদিকে ছিল বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে আমাদের নিজেদের মূল্যবোধ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে।’
নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে এতটা নারীবিদ্বেষী ভাষা আগে শোনেননি। সামাজিক মাধ্যমেও শুধু নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নারীবাদের কোনো বিরোধ নেই, বরং নারীর অধিকার রক্ষায় সরকার দুটি নতুন আইন করেছে। একটি পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং অন্যটি কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধে।’
জেল থেকে উগ্রবাদীদের মুক্তি পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আইনি জটিলতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে অনেককে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’ বলে জানান তিনি।
তার মতে, উগ্রবাদী শক্তি সমাজে আগে থেকেই ছিল এবং বিভিন্ন সময় সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তারা কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারেনি।
যারা নারীর অধিকার ও সমান অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের রাজনৈতিক শক্তি যেন মূলধারায় প্রভাব বিস্তার করতে না পারে—এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল, বলেন রিজওয়ানা হাসান।রাজনৈতিক সেমিনার
তবে নারীর প্রতি উগ্রবাদ বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গত ৫ই মার্চ জাতীয় একটি গণমাধ্যমকে বলেন, তার ওই বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচনের প্রসঙ্গ যুক্ত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে আলাপে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচন ও বিরোধী দলকে জড়িয়ে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তা ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ও ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’।
বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আলাপের একপর্যায়ে উপস্থাপক নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুললে তখন তিনি বলেন, বিরোধী দলের যেসব উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেসব বিষয়ে তারা কাজ করবেন। এরপর তিনি আবার মূল প্রশ্নে ফিরে গিয়ে উগ্রবাদ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।
তার দাবি, পুরো আলোচনায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি, কারণ সেটি প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ছিল না। বিরোধী দল অবশ্যই মূলধারার অংশ—এ কথা উল্লেখ করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'আমি কোনো দলকে মেইন স্ট্রিম হতে দিইনি বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেটা কেবলই অপব্যাখ্যা, অবান্তর এবং বিভ্রান্তিকর। আমার বক্তব্য ছিল উগ্রবাদী শক্তি বিষয়ে, কোনো দলের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য ছিল না।'
এদিকে গত ৫ই মার্চ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামী। দলটি এই দুই সাবেক উপদেষ্টাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের বিচার দাবি করে।
খবরটি শেয়ার করুন