ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঢাকায় আয়োজিত সরকারি এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বক্তব্য শেষ করে আলোচনা তৈরি করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তার বক্তব্যের একটি ভিডিও ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজ শুক্রবার (৬ই মার্চ) ছড়িয়ে পড়েছে। যা নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন অতীতে ‘জয় বাংলা’ বলে বক্তব্য শেষ করলেও এখন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলাতেই এই আলোচনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতারা 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' বলে সাধারণত তাদের বক্তব্য শেষ করে থাকেন। সাধারণ বিভাজনে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' শ্লোগানটি বিএনপির আর আওয়ামী লীগের শ্লোগান 'জয় বাংলা'।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় আয়োজনগুলোয় বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি রাষ্ট্রপতিকে। সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের শাসনের পর এই প্রথম তিনি সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখলেন বিএনপির নতুন সরকারের সময়ে। বিএনপির সরকারের সময়ে তার প্রথম বক্তব্য নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এই বক্তব্যের জেরে আলোচনা উঠে আসছে, মো. সাহাবুদ্দিন কি বিএনপিকে খুশি রেখে নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করতে চাচ্ছেন, অর্থাৎ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে চাচ্ছেন? সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন কিনা—রয়টার্সের এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গত বছরই অস্বীকৃতি জানান তিনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে তিনি দলনিরপেক্ষ, কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
জুলাই অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গত বছরের আগস্টে দেওয়া এক বাণীতে মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগকে 'ফ্যাসিবাদী শক্তি' উল্লেখ করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন করে জুলাইয়ে চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের আহবান জানান। যদিও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—রাষ্ট্রপতি পদে কে আসছেন। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে নিশ্চিত করেছে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে চান। বিএনপিকে একধরনের খুশি রেখে আপাতত মো. শাহাবুদ্দিন এই পদে থাকতে চাচ্ছেন।
যদিও গত বছরের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন তিনি। তখন তিনি বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বারা তিনি অপমানিত বোধ করছেন।
সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর থেকে রাষ্ট্রপতিকে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে দেওয়া ও না দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে দুটি মত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা দরকার। এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের দিক থেকেও বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে সরানোর দাবি উঠেছে।
তবে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাদের নাম বিবেচনায়—জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনা কেন—সে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বিএনপিতে তিন-চারজন আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনা কেন? সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ তো শেষ হয়নি।’
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির মহাসচিবের এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, দলটির অনেকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ পূর্ণ করার পক্ষে।
সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে বিএনপির ভেতরের আপাতত দুই মত থাকার কারণ বিশ্লেষণ করে সূত্র বলছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর জন্য বিদেশি চাপ আসতে পারে বলে কারো কারো ধারণা। ড. ইউনূসের চেয়ে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ করতে দেওয়ার চিন্তা বিএনপিতে তা-ই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের দ্য ওয়াল এক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে বলে, অবসর জীবনে ড. ইউনূসকে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। তিনি কি তাহলে এরপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন? জল্পনা আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আরও কয়েকটি দেশের তরফে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের উপর চাপ আছে ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার। এই ব্যাপারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দাবি তুলে আসছে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো দলগুলো।
বিএনপির একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন মেয়াদ পূর্ণ করতে চান, এ বিষয়ে তাকে বিএনপির একাংশ সমর্থনও করছে। দলে প্রভাবশালী ও বিএনপির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী জাতীয় একটি দৈনিকের মালিককে সম্প্রতি বলে দেন, তার সংবাদমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে। ওই ব্যক্তির মালিকানার পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রশংসা করেন। সাক্ষাৎকারটি দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আড়াই মাসের মাথায় ১৯শে অক্টোবর দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।
এই কথোপকথন পত্রিকাটির রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনতার চোখ’-এ প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে ও বাইরে সরব হয় ওঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন না চাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমপক্ষে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির অপসারণ কিংবা পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও কিংবা বড় ধরনের চাপ তৈরি করা হলেও মো. সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনেই।
তখন উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান কয়েক উপদেষ্টা। তারা রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে একজন বিচারপতিকে বসিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ বা অভিশংসন করার ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংসদ ছিল না; কিন্তু তখন অনেক কিছু আইনের বাইরে হয়। সরকার তাই চাইলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে পারে বলে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে মতামত দেন ওই সময়ের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন।
রাষ্ট্রপতিকে আসিফ নজরুলদের অপসারণের পরিকল্পনা সফল হতে দেয়নি বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনার মধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের তিন নেতা ২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর তখনের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে এই বিষয়ে তাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অবস্থান জানান।
তারা তখন বলেন, এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে দেশে কোনো ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা বা অস্থিরতা তৈরি হোক, দলটি তা চায় না। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
খবরটি শেয়ার করুন