ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে মূলত শ্রমবাজার, ধর্মীয় যোগাযোগ এবং রেমিট্যান্সকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কয়েক দশক ধরে লাখ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে দুই দেশের মধ্যে বৃহৎ বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিল্প ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্পর্ক এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ সেই সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ. বিন আবিয়াহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চিঠিতে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ। একই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণও গ্রহণ করেন। বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সম্ভাব্য ঢাকা সফর এবং সৌদি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়েও আলোচনা হয়।
দ্য ডেইলি স্টার, ইউএনবি, বাসসসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগভিত্তিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তারেক রহমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা সরকারের সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থানের পরিচয় দিচ্ছে। সৌদি যুবরাজের সম্ভাব্য সফর সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব বর্তমানে "ভিশন ২০৩০" কর্মসূচির আওতায় অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং সৌদি দৈনিক আরব নিউজ-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, পর্যটন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ এখন সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কৌশলের প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও দেশটি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি সৌদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
অতীতেও সৌদি আরব বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকো মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে তেল শোধনাগার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামো এবং পেট্রোরসায়ন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসেফ ঈসা আল দুহাইলানও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, সৌদি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে সমস্যার মুখে পড়েছেন। একইভাবে লালমনিরহাটে আঞ্চলিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব বাংলাদেশি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও অন্যান্য দক্ষ জনবল নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অনুসরণ না থাকায় সেই উদ্যোগও আর অগ্রসর হয়নি।
বর্তমান সরকার এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সমন্বয় ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের সফরের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের "ভিশন ২০৩০" কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, লজিস্টিকস এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের বিশ্ব এক্সপো এবং ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে সৌদি আরবে চলমান বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রমে দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেছেন, সম্ভাব্য সফরের আগে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পগুলোর একটি সুস্পষ্ট তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চল, বন্দর, জ্বালানি, বিমান চলাচল, লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করা হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই সফর সফল হলে বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ক শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সকেন্দ্রিক সহযোগিতার বাইরে বিনিয়োগ, শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
তাদের মতে, বর্তমান সরকারের সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সৌদি যুবরাজের সম্ভাব্য ঢাকা সফর সেই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখন সফরকে কেন্দ্র করে যেসব অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন