ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
ওয়াশিংটনের এই অবস্থানকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষকে সমর্থন করছে—এমন সরাসরি বক্তব্য ব্রিফিংয়ে দেওয়া হয়নি।
গতকাল ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ঢাকার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এর আগের দিন, ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থনে মার্কিন নীতি’ শিরোনামে ব্রিফিংটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকেরা অংশ নেন। ব্রিফিংয়ের আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানি মরিসন দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে বক্তব্য দেন।
ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ বা উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে কী করা উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান জানায়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা কিংবা ভারতে তার অবস্থান অব্যাহত রাখা—এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো নির্দিষ্ট সমাধান সামনে আনেনি। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে সরাসরি নিজেদের দ্বিপক্ষীয় বা একতরফা সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবে না দেখে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেটিকে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সামলানোর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান নিয়েছে বলে ব্রিফিং থেকে বোঝা যায়।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ভারত চলে যান এবং এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। এদিকে বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাওয়া প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে আগের অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি ধারাবাহিকতা যেমন দেখা যায়, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু পরিবর্তনও চোখে পড়ে। ২০২৫ সালের ১৩ মে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখ্য উপমুখপাত্র টমাস পিগটকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবগত। একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে অন্য দলের তুলনায় বেশি সমর্থন করে না।
পিগট সে সময় অবাধ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সবার জন্য ন্যায্য ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনের কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সংগঠনের অধিকারকে সম্মান করার জন্য বাংলাদেশসহ সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কথাও বলেছিল।
প্রায় দেড় বছর পরের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের ভাষায় নতুন একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। এবার মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহের কথা সরাসরি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে বাংলাদেশ ও বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী বলেও জানান।
এখানেই বর্তমান সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের আস্থার একটি কূটনৈতিক ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তার শপথকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৩ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তার বিজয় বাংলাদেশের জনগণের তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতি ম্যান্ডেটের প্রতিফলন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও জানান।
ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকেও বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানো হয় এবং নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা। সাম্প্রতিক মার্কিন বক্তব্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সমৃদ্ধির প্রচেষ্টায় পাশে থাকার কথা বলা হয়েছে। একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ককে ভালো অবস্থানে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণে এটি বর্তমান সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কার্যকর সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শেখ হাসিনার বিষয়টি অবশ্য শুধু ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ তাকে ফেরত চায়, আর ভারত বলেছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রও স্বীকার করেছে যে তার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিরোধের কারণ হয়ে আছে। তাই ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক অবস্থান মূলত এই ইস্যুতে সরাসরি কোনো সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনাকে উৎসাহিত করার কূটনৈতিক পন্থা।
এ অবস্থানের সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য ইতিবাচক মনোভাব পাশাপাশি রাখলে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে। শেখ হাসিনার বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না, কিন্তু একই সঙ্গে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার ও কাজ অব্যাহত রাখার কথা বলছে। অর্থাৎ হাসিনা-প্রশ্ন এবং তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে একই কূটনৈতিক সমীকরণে না দেখে পৃথকভাবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
সব মিলিয়ে মার্কিন বক্তব্যকে তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়নি। দ্বিতীয়ত, তাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। তৃতীয়ত, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো রয়েছে এবং সেই সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চায় বলে প্রকাশ্যে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। একদিকে ওয়াশিংটন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নিচ্ছে না।
খবরটি শেয়ার করুন