ছবি: সংগৃহীত
‘আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ’—জাতীয় সংসদে দেওয়া এমন একটি বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও পরে জানা যায়, তার বাবা এখনো জীবিত। একই সঙ্গে তার জন্মসাল নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, কারণ নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি, যা মুক্তিযুদ্ধের প্রায় এক দশক পরে।
সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আব্দুল মুনতাকিম বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা ৭ ভাই, ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।’
সংসদে দেওয়া এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হয় নানা প্রশ্ন। ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ জানতে চান, একজন ব্যক্তি কীভাবে নিজেকে শহীদের সন্তান দাবি করেন, অথচ তার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের ১০ বছর পরে এবং তার বাবা এখনো জীবিত?
পরবর্তীতে হলফনামা ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য সামনে আসতে থাকে। সেখানে দেখা যায়, আব্দুল মুনতাকিমের বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং মা মোসলমান বেগম দুজনেই জীবিত। তারা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে বসবাস করছেন।
সমালোচনার মুখে সংসদ সদস্য নিজেই বক্তব্যটিকে ভুল বলে স্বীকার করেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ভুল তথ্য ও শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তার দলীয় সহকর্মীরা ঘটনাটিকে ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখ ফসকে হওয়া ভুল বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে বিষয়টি শুধু একটি বক্তব্যগত ভুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কারণ, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ফলে একজন জামায়াত সংসদ সদস্যের মুখে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ পরিবারের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আসায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতের তৎকালীন পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের বড় অংশ উল্লেখ করে থাকেন। স্বাধীনতার পর দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক চলে। ২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার বিচার হয়। এসব বিচারে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা এবং আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আদালতের রায়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্কও ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠনগুলো এসব বিচারকে দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জামায়াত নেতাদের কিছু বক্তব্য অতীতেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দলটির প্রয়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একসময় প্রকাশ্যে বলেছিলেন, দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই—এমন বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। পরে যুদ্ধাপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদ পরিবারের পরিচয়, বা যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে সামান্য অসতর্কতাও জনমনে বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কারণ এসব বিষয় রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আব্দুল মুনতাকিমের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা থামছে না। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদ রেজা নামে একজন লিখেছেন, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে দেওয়া বক্তব্যের আগে একজন জনপ্রতিনিধির তথ্য যাচাই করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিষয়ে ভুল বলার সুযোগ নেই।’
আরেক ব্যবহারকারী নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, ‘ভুল হতেই পারে। কিন্তু এমন ভুল যদি একজন সংসদ সদস্য করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।’
রাকিব হাসান নামের এক নেটিজেন লিখেছেন, ‘বাবা জীবিত অথচ শহীদের সন্তান দাবি—এটা সাধারণ ভুল হিসেবে মানুষ নিতে পারছে না। কারণ বিষয়টি আবেগের সঙ্গে জড়িত।’
তবে সবাই যে সমালোচনা করেছেন, তা নয়। আবদুল্লাহ আল মামুন নামে একজন লিখেছেন, ‘মানুষ ভুল করতেই পারে। তিনি ভুল স্বীকার করেছেন, এটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আব্দুল মুনতাকিমের এ বক্তব্য হয়তো একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদদের স্মৃতি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে একটি মাত্র বাক্যও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সংসদ সদস্যের দুঃখ প্রকাশের পরও আলোচনা পুরোপুরি থামেনি। বরং তার বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জামায়াতের অতীত ভূমিকা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে। সেই বিতর্ক এখন সংসদ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই সমানভাবে আলোচিত হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন