ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি ডিগ্রি কলেজে এক শিক্ষিকাকে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে বিএনপি পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি এক নারী শিক্ষিকাকে মারধর করছেন।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় উঠলেও, ঘটনার আগে–পরে কী ঘটেছিল—সেসব তথ্যের বড় অংশই মূলধারার অনেক গণমাধ্যমে উঠে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে আজ শুক্রবার মুঠোফোনে কথা বলে ঘটনার একটি বিস্তৃত চিত্র পেয়েছে সুখবর ডটকম।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ৪ ও ৫ মে দাওকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এই মাহফিল উপলক্ষে আমন্ত্রণপত্র বিতরণ এবং আর্থিক সহযোগিতা সংগ্রহের জন্য এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে যান।
সেই সময় অধ্যক্ষের কক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা আলেয়া খাতুন হীরা। তিনি অধ্যক্ষের পাশের চেয়ারে বসেছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি মুঠোফোনে পুরো বিষয়টি ভিডিও করতে শুরু করেন। এতে উপস্থিত বিএনপির নেতারা আপত্তি জানান এবং ভিডিও না করতে অনুরোধ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করেই মূলত উত্তেজনার সূত্রপাত। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভিডিও চালিয়ে যাওয়ায় শিক্ষিকা ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন আলেয়া খাতুন উপস্থিত সবার সামনে বিএনপির এক নেতাকে থাপ্পড় মারেন। এর পরপরই ঘটনাস্থলে থাকা এক বিএনপি নেতা উত্তেজিত হয়ে পায়ের স্যান্ডেল খুলে শিক্ষিকাকে মারধর করেন। এই অংশের ভিডিওই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
তবে এখানেই ঘটনা শেষ হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনার পর বিএনপি নেতারা কলেজ ত্যাগ করার সময় কলেজ মাঠে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এসময় আলেয়া খাতুন হীরা বিএনপির এক নেতাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং আরও কয়েকজনকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন জয়নগর ইউনিয়ন কৃষকদল নেতা জয়নাল আবেদিন, মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদত হোসেন এবং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এজদার আলী।
কলেজের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, আলেয়া খাতুন হীরা অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। এক শিক্ষক বলেন, “তিনি অনেক সময় সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। কোনো বিষয় নিয়ে মতভেদ হলে সেটা দ্রুত উত্তেজনায় গড়ায়।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলেয়া খাতুন হীরা। তিনি আজ বিকেলে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “যারা এসেছিলেন, তারা মাহফিলের নামে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। আমি বিষয়টি ভিডিও করতে শুরু করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অধ্যক্ষকে রক্ষা করতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। তারা আমাকে মারধর করেছে।”
কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে সুখবরের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেক জাতীয় গণমাধ্যমে কেবল শিক্ষিকাকে মারধরের অংশটিই গুরুত্ব পেয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়নি। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ভিডিওতে যা দেখা গেছে, সেটা সত্য। কিন্তু পুরো ঘটনা সেটা নয়। আগে কী হয়েছে, কেন হয়েছে—সেটা না জানলে বিচার করা ঠিক না।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে নানা মতামত দেখা গেছে।
ঢাকার বাসিন্দা মাহবুব হাসান লিখেছেন, “একজন নারী শিক্ষিকাকে মারধর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু পুরো ঘটনা না জেনে একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করাও ঠিক না।” রাজশাহীর ফারহানা ইসলাম বলেন, “যদি শিক্ষিকা আগে আঘাত করে থাকেন, সেটাও ভুল। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় এভাবে মারধর করা আরও বড় অপরাধ।”
চট্টগ্রামের সাইফুল আরেফিন মন্তব্য করেন, “রাজনীতি এখন এমন জায়গায় গেছে, যেখানে সামান্য বিষয়ও সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। সবাইকে সংযত হতে হবে।” অন্যদিকে বরিশালের নাহিদ রহমান লিখেছেন, “মিডিয়া অনেক সময় ঘটনাকে একদিক থেকে দেখায়। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। সত্য তুলে ধরা জরুরি।”
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি যে দিক থেকেই দেখা হোক না কেন, সহিংসতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একজন শিক্ষকের প্রতি এমন আচরণ যেমন নিন্দনীয়, তেমনি যেকোনো পরিস্থিতিতে শারীরিক আক্রমণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন শিক্ষাবিদ বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হওয়া উচিত ছিল।”
দাওকান্দি সরকারি ডিগ্রি কলেজের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, একটি ঘটনার আংশিক ভিডিও বা তথ্য দিয়ে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—যে পক্ষই হোক, সহিংসতার কোনো বৈধতা নেই। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি গণমাধ্যমের কাছেও প্রত্যাশা—তারা যেন পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যভিত্তিক চিত্র তুলে ধরে, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
খবরটি শেয়ার করুন