ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের উখিয়ায় নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন ২৬ ঘণ্টার বেশি সময় পরও নেভেনি।
গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় আপাতত আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে গ্যাসের প্রবাহ কমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞরা।
তাদের আশঙ্কা, আগুন নেভানো হলে ভূগর্ভের অন্য ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে নতুন করে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ পরিস্থিতিতে আগুনের উৎসস্থলের চারপাশে অন্তত ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধের পরিকল্পনা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উখিয়ার ছোট ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে নলকূপ বসানোর জন্য খননকাজ করার সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, ঘটনাটি গ্যাসকূপে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস বেরিয়ে আসার ঘটনার মতো বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক ধারণা, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসসমৃদ্ধ একটি স্তরের ওপরের অংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল খননকাজ। ওই স্তরের কিছু অংশ খুলে যাওয়ায় চাপের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। ফলে উচ্চচাপের গ্যাস বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে।’
আরহাম বলেন, ভূগর্ভের অতি সূক্ষ্ম ফাটল বা ফাটলপথ দিয়ে গ্যাস কয়েক দিন ধরে ধীরে ধীরে ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে শেষ পর্যন্ত নলকূপের গর্ত দিয়ে বের হওয়ার পথ পেয়ে থাকতে পারে।
আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানান তিনি। তার ধারণা, বেরিয়ে আসা গ্যাসে কোনো স্ফুলিঙ্গ বা অন্য কোনো আগুনের উৎস থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
আরহাম বলেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত গ্যাসের প্রবাহ সামাল দেওয়া কঠিন। গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য দুর্বল স্তর বা ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বিপদ এড়াতে আশপাশের মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কারণ ঘটনাস্থলের কাছেই বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বসতবাড়ি রয়েছে।
বাপেক্সের এই কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। এতে গ্যাসের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য জানা যাবে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হবে।
আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার রং দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বনের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা। তবে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ ছাড়া গ্যাসের প্রকৃত উপাদান নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের প্রবাহ ও চাপের ধরন গ্যাসকূপে খননের সময় দেখা কিছু পরিস্থিতির মতো। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল থেকে গ্যাস বের হওয়ার তীব্রতা বেড়েছে।
মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে ইনানী ছোট সেতুর কাছে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর এসব কথা বলেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা তাদের জানিয়েছেন, আগুন সাত থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত জ্বলতে পারে। তবে ঠিক কত দিন আগুন জ্বলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা করেও আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, গতকাল সকাল থেকে আমাদের চারটি ইউনিট কাজ করছে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি, কিন্তু আগুন নেভাতে পারিনি।
মোরশেদ জানান, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাপেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।
বাপেক্সের দলের প্রধানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে গ্যাসের চাপ প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার পাউন্ড (পিএসআই) বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোরশেদ বলেন, আগুন নেভানো হলে গ্যাস জমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার চাপ প্রয়োগ করে গ্যাস বের হওয়ার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করলে তা অন্য জায়গা দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘তাদের পরামর্শ হলো, গ্যাসের প্রবাহ কমে আসা পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেওয়া এবং অপেক্ষা করা।’
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সার্বক্ষণিক ঘটনাস্থলে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়েছেন। তারা আক্রান্ত এলাকাটি বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তাবলয় তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন প্রধান কাজ হলো, অন্তত ২০০ মিটার বা তার বেশি এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষ বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করতে না পারেন।’
খবরটি শেয়ার করুন