ছবি: সংগৃহীত
শংকর মৈত্র
বিচার বিভাগের জন্য এটা অবশ্যই একটি সুখবর। অধস্তন আদালত নির্বাহী বিভাগ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে গেল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছে। ১১ই ডিসেম্বর থেকে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।
এই যাত্রা বিচার বিভাগের জন্য সুফল বয়ে নিয়ে আসবে বলে আশা করি। এখন থেকে নিম্ন-আদালতের বিচারকদের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায়।
আগে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হত, তবে সেটা নামকাওয়াস্তে। অধ্যাদেশ জারি করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় একজন কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলো।
৩০শে নভেস্বর জারি করা অধ্যাদেশে যদিও বেশ কিছু 'কিংবা' রয়েছে। তবে সময়ে এগুলোও ঠিক হয়ে যাবে। শুরু হয়েছে এর জন্যই ধন্যবাদ। ধন্যবাদ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে। বিদায় বেলায় একটি ভালো কাজ করার জন্য।
আমার অবশ্য নামটি পছন্দ হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় না বলে এটাকে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বললে ভালো শোনাতো। স্মার্ট শোনা যেতো। সেক্রেটারিয়েট অব জুডিশিয়ারি। কারণ, পুরো বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ হবে এখান থেকে। নির্বাচিত সরকার এসে চাইলে নামটি পরিবর্তন করতে পারে।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের মামলা, যা মাসদার হোসেন মামলা হিসেবে পরিচিত, সেই রায় আপিল বিভাগে ঘোষিত হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলো এই রায় বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের আমলারা। কারণ তাদের পাওয়ারফুল বিচারিক ক্ষমতা চলে যাবে। এ জন্য আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ শুনানি পর্যন্ত হয়েছিল, নানা কূটচাল চালানো হয়েছিল।
সরকারও আমলাদের পক্ষেই ছিল। বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদের মতো জাঁদরেল আইনমন্ত্রীও অসহায় ছিলেন। রায় বাস্তবায়নের জন্য দিনের পর দিন আদালতে লড়েছেন ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। বলা যায় তিনি এককভাবেই মামলাটি টেনেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আইনি লড়াই করেছেন। আমরা মিডিয়ার লোকজনও মামলার শুনানি কভার করেছি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য নানা সংবাদ প্রকাশ করেছি।
কিন্তু তখনকার বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার এই রায় বাস্তবায়ন করতেই পারেনি। শেষ পর্যন্ত ফখরুদ্দীন-মঈন উদ্দীনের তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আইন উপদেষ্টা মইনুল হোসেনের চেষ্টায় ২০০৭ সালে ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়ন করে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই অবদানের জন্য প্রয়াত মইনুল হোসেনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
এর পরের দেড় দশক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও রায়ের অন্যতম নির্দেশনা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করা হয়নি, নিম্ন আদালতের বিচারকদের উপর আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ন্যাক্কারজনকভাবে করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত আরেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এগিয়ে গেল। এটা বিচার বিভাগের জন্য ভালো খবর। ধন্যবাদ আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে। নানা বিতর্কের মধ্যেও তিনি একটা ভালো কাজ করেছেন।
তবে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা যতোই দেওয়া হোক, বিচারকেরা যদি ন্যায়নিষ্ঠ, নীতিপরায়ণ না হন, সাহসী না হন, লোভ-লালসার উর্ধ্বে ওঠতে না পারেন, তাহলে কোনো আইনই কাজে আসবে না।
বিচারকদের বুঝতে হবে তারাই মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ন্যায় বিচারের ফরিয়াদ নিয়ে মানুষ তাদের কাছেই যায়। আমাদের বিচার বিভাগ হোক ন্যায় বিচারের আশ্রয়স্থল। এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন