ফাইল ছবি
সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনির সাম্প্রতিক এক বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন—জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের চেয়েও বিএনপিকে বেশি ভয় পাচ্ছে—তা সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্প্রতি একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া বক্তব্যে গোলাম মাওলা রনি বলেন, 'বর্তমান সরকারের প্রতি যে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল জামায়াত ও এনসিপি, এখন তার কোনো লক্ষণ আর দেখা যাচ্ছে না। তারা এমন অবস্থানে গেছে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের চেয়েও বিএনপিকে বেশি ভয়ংকর হিসেবে বিবেচনা করছে।' তার এই মন্তব্যে রাজনৈতিক সমীকরণের একটি পরিবর্তিত বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
রনি তার বক্তব্যে আরও বলেন, 'সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে জামায়াতের ওপর চড়াও হয়েছিলেন, তার চেয়েও বেশি মানে হাঙ্কি-পাঙ্কি ভুংভাং জামায়াত করে, তাহলে তার চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুরতা নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করা হবে।' এই বক্তব্যে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন—রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ক্ষমতার পালাবদল হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহারে আরও কঠোরতা দেখা যেতে পারে।
তিনি অতীতের ঘটনাও তুলে ধরেন। বলেন, 'জামায়াতের অফিসে তালা লাগানো হয়েছিল। জামায়াতকে এক্সিকিউটিভ অর্ডার দিয়ে তাদের রাজনীতির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু দল হিসেবে জামায়াতকে বিচারের মুখোমুখি করেননি শেখ হাসিনা। দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেননি। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে অভিযুক্ত। তাদের বিচার করা হবে।'
এই অংশে রনি তুলনা টানতে চেয়েছেন—রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। তার মতে, একটি বড় ও ঐতিহ্যবাহী দল যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে, তবে অন্য দলগুলোর জন্যও ঝুঁকি অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, 'আওয়ামী লীগের মতো একটা বড় ও ঐতিহ্যবাহী দলকে যদি এই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে জামায়াত কোন ড্যাস। জামায়াতকে তারা কী করতে পারে এটা জামায়াত কি বোঝে না? ফলে জামায়াত বাসর রাতে বিড়াল মারার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদের যে তরুণ তুর্কি আছে তাদের খেপিয়ে তুলছে। জামায়াতের যে অংশটি, সম্ভবত ড. ইউনূসের সঙ্গে যাদের দহরম-মহরম সম্পর্ক ছিল, সবার বিরুদ্ধে তারা এখন উঠে-পড়ে লাগছে। তারা আসিফ নজরুলের বিচার চাচ্ছেন। আসিফ নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হবে।'
এই বক্তব্যে রনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আগাম অবস্থান নেওয়ার একটি কৌশলের কথা ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ‘বাসর রাতে বিড়াল মারা’—এই উপমা দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শুরুতেই কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
রনি আরও কিছু সম্ভাব্য গ্রেপ্তার ও বিচার প্রসঙ্গও তোলেন। তার ভাষায়, 'রিজওয়ানাকে গ্রেপ্তার করা হবে। সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খানকে গ্রেপ্তার করা হবে। আরো যারা আছেন, আদিলুর রহমান শুভ্র, ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন অনেক গুপ্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে যদি জনমত জরিপ করে ফেলা হয়, তাহলে তাদের বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
এছাড়া তিনি বলেন, 'দেশের পত্র-পত্রিকা, সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক মাধ্যম এদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। এ ছাড়া জামায়াত ও এনসিপি সরাসরি কথা বলছে তাদের বিরুদ্ধে। আর তারা যদি গ্রেপ্তারবরণ করেন এবং মামলার মধ্যে পড়েন, বিব্রতকর পরিস্থিতেতে পড়েন কিংবা রাস্তায় বের হতে না পারেন তাহলে ওই যে ডিপ স্টেটের কানেক্টটিভিটি ছিল, সেই কানেক্টিভিটি বুমেরাং হয়ে যাবে। যেটা সরকার সামাল দিতে পারবে না। এই কাজটিই করা হচ্ছে অসম্ভব মেটিকুলাস ডিজাইনের অ্যান্ডারে।'
গোলাম মাওলা রনির বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত ও সংঘাতমুখর হিসেবে দেখছেন। তার মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের টিকে থাকার কৌশল হিসেবে আগাম আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, তিনি ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এতে বোঝানো হয়েছে—রাজনীতির বাইরে থেকেও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে, এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কই ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে রনির বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক নেটিজেন মনে করছেন, তিনি মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ এই বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মনে করছেন। তাদের মতে, সম্ভাব্য গ্রেপ্তার বা বিচার নিয়ে আগাম মন্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন