ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে (এজেকে) নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের খবর প্রকাশের পর কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমটিকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়নি। তবে দেশটির বহু ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন, তারা আল জাজিরার ইংরেজি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারছেন না।
একই সময়ে ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে আল জাজিরার প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছে এবং সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা চাঞ্চল্যকর সাংবাদিকতার অভিযোগ তুলেছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, আল জাজিরা ‘বাছাই করা’ ভোটকেন্দ্র ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তুলে ধরে আজাদ কাশ্মীরের নির্বাচনকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতিবেদন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি বাইরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে আল জাজিরার প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাস থেকে আজাদ কাশ্মীরে চলা আন্দোলনে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন, বহু এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং নির্বাচন নিরাপত্তাজনিত কারণে তিন ধাপে আয়োজন করতে হয়েছে। আল জাজিরার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক প্রার্থীও অভিযোগ করেছেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেননি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কি কার্যত আল জাজিরাকে ব্লক করেছে? সরকার এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ভেতরে আল জাজিরার ওয়েবসাইটে প্রবেশে বাধা দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াও জানিয়েছে, কাশ্মীর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশকারী একাধিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি আল জাজিরার প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভোটগ্রহণ সহিংসতায় আচ্ছন্ন ছিল। আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে বিরোধ এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে অঞ্চলটি গভীর সংকটে পড়েছে।
একই ধরনের তথ্য দিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটিকে (জেএএসি) নির্বাচন নস্যাৎ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করছে, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান আরও কঠোর ভাষায় জানিয়েছে, বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৩০ জন নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং ঘটনার জন্য ‘বহিরাগত প্রভাব’কে দায়ী করেছে।
একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বাধীন তদন্ত ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আজাদ কাশ্মীরে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগে বিধিনিষেধ, সংবাদ সংগ্রহে বাধা এবং সাংবাদিকদের আটক বা নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সিপিজের তথ্যমতে, স্বাধীন সাংবাদিক রাজি তাহির ও তার সহকর্মী মোহাম্মদ সাইফকে ১ আগস্ট থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিরা ইসলামাবাদে তাদের অফিস থেকে নিয়ে যান। সংস্থাটি পাকিস্তান সরকারের কাছে তাদের অবস্থান প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাকে শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়বে না। বরং এটি পাকিস্তানে ডিজিটাল সেন্সরশিপ, নির্বাচনকালীন তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অংশ। পাকিস্তানে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সীমিত করার অভিযোগ উঠেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ১২টি ‘শরণার্থী আসন’ নিয়ে বিতর্ক, যা আজাদ কাশ্মীরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের বিষয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলো ইসলামাবাদের প্রভাব বজায় রাখার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এসব আসন সাংবিধানিক ব্যবস্থার অংশ এবং পরিবর্তনের জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আল জাজিরাকে নিষিদ্ধ না-ও করে থাকে, তবু ওয়েবসাইটে প্রবেশ সীমিত করা এবং প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কাতারভিত্তিক একটি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কিত ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে আল জাজিরাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করার কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আইনগত আদেশ প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওয়েবসাইটে প্রবেশে বাধা, সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি শুধু একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন