ফাইল ছবি
মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলছেন, দেশে ফিরে তিনি আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তবে বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। কোনো পূর্বনির্ধারিত রায় তিনি মেনে নেবেন না। তার ভাষায়, ‘ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।’
গতকাল শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভারতের নিউজ১৮ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ‘ফিয়ার ক্যান্ট ডিসাইড মাই ডিউটি: শেখ হাসিনা অন রিটার্ন টু বাংলাদেশ ডিজপাইট ডেথ সেন্টেন্স’। প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার পরিকল্পনা, নিজের বিরুদ্ধে হওয়া বিচার, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অবস্থা, দলের ভবিষ্যৎ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা, ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এবং তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন নয়। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তখন তিনি বলেছিলেন, দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে—তবু তিনি ফিরবেন।
নিউজ১৮ ইন্ডিয়ার সাক্ষাৎকারে তাকে প্রথমেই প্রশ্ন করা হয়, ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত তিনি চূড়ান্ত করেছেন কি না। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ তার দেশ। তার পুরো রাজনৈতিক জীবন কেটেছে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে। কারাবরণ, নিপীড়ন, হত্যাচেষ্টা ও মৃত্যুর হুমকি—এসবের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতি করেছেন। দেশের মানুষ যখন কঠিন সময় পার করছে, তখন দেশের বাইরে থাকার জন্য তিনি রাজনীতিতে আসেননি। তাই দেশে ফিরতে চান। আদালতের মুখোমুখি হতে এবং নিজের বক্তব্য দিতে প্রস্তুত আছেন। তবে বিচারকে পূর্বনির্ধারিত রায় হিসেবে দেখতে চান না।
এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ফেরার প্রক্রিয়াটি কী হবে। আওয়ামী লীগের নেতারা আগে ফিরবেন, নাকি সবাই একসঙ্গে ফিরবেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিষয়টি বাস্তব ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। কে আগে ফিরবেন বা ধাপে ধাপে ফিরবেন, তা দায়িত্বশীলভাবে ঠিক করা হবে। তবে রাজনৈতিক অবস্থানের জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত পরিষ্কার। দলটি বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না, জনগণকে ছেড়ে যাবে না এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামও ছেড়ে যাবে না।
এই প্রসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বর্তমান অবস্থার কথাও তুলে ধরেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ সমর্থকেরা গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা, চাকরি থেকে বরখাস্ত, হামলা ও ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। অনেকে বাড়িঘর ছেড়েছেন। কেউ কেউ দেশও ছেড়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা অপরাধী নন; তারা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার।’
তবে এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটটি রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে বিতর্কিত। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সহিংস ব্যক্তিরা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিলেন। জাতিসংঘের হিসাবে ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগের কথাও বলা হয়।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, এমন আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে ফিরতে চান কেন? তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার মাতৃভূমি। তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবন দিয়েছেন। তার মা, ভাই ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বাংলাদেশের মাটিতে নিহত হয়েছেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, আওয়ামী লীগের লাখো সমর্থককে এমনভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেন নিজ দেশে তাদের কোনো বৈধ অধিকার নেই। এই অবস্থায় দেশের বাইরে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
দেশে ফেরাকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও সাক্ষাৎকারে দাবি করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তার দেশে ফেরার উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া নয়। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ জনগণকে দেওয়া তার লক্ষ্য।
নিজের সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। তার দাবি, তার সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তি পেয়েছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, এক্সপ্রেসওয়ে, সড়ক, সেতু, বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, কমিউনিটি ক্লিনিক সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমিহীনদের ঘর, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের কথাও তুলে ধরেন।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের তুলনাও দেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্য, তার সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে ২ হাজার ৭৮৪ ডলারে ওঠে। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
এরপর তিনি ২০২৪ সালের আগস্টের পরের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমেছে। বিনিয়োগ কমেছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তার দেওয়া হিসাবে দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে। বেকারত্বও বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। দুই বছরে ৮৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার মানুষ সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন বলেও সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি।
এসব পরিসংখ্যান সম্পর্কে সাক্ষাৎকারে স্বাধীন কোনো যাচাই দেওয়া হয়নি। ফলে এগুলো শেখ হাসিনার নিজের দেওয়া হিসাব হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
এরপর প্রশ্ন আসে, দেশে ফিরলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তিনি নিজেই আশঙ্কা করেছেন। তারপরও কেন ফিরতে চান। শেখ হাসিনা বলেন, তার জীবন নেওয়ার জন্য ১৯ বার চেষ্টা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যা করা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। হামলায় ২৪ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হন। এসব অভিজ্ঞতার কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি তিনি বোঝেন। কিন্তু রাজনৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে ভয়কে তিনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি করতে চান না।
মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে তার উদ্বেগের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নিজের জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তার উদ্বেগ বিচারব্যবস্থা নিয়ে। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য আদালত, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে তিনি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শেখ হাসিনা তখনও এই বিচারকে প্রত্যাখ্যান করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সাবেক নেতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপগুলোর একটি।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়নি। তার আইনজীবীদের সুযোগ, সাক্ষীদের জেরা, প্রমাণ উপস্থাপন ও চ্যালেঞ্জ করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, আসামির পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যে কোনো রায় ন্যায়বিচার হতে পারে না।
তিনি বলেন, তার সরকারের সময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে যে আইন করা হয়েছিল, সেটিই এখন তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। ন্যায়বিচারে বিশ্বাস থাকলে তাকে আদালতে হাজির হয়ে প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান সরকার বা বিএনপির সঙ্গে তার কোনো গোপন যোগাযোগ বা সমঝোতা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নেরও উত্তর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার নিজের এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে তার কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নেই। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিচারব্যবহারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসবের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
সরকার যদি তাকে দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানায়, তিনি ফিরতে প্রস্তুত বলেও জানান। তবে তার চাওয়া কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা নয়। তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনজীবীর সহায়তা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ বিচার, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং আপিলের অধিকার চান।
ভারতের ভূমিকা নিয়েও তাকে প্রশ্ন করা হয়। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে। ভারত সরকারকে তার দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কি না এবং ভারত কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত একটি সার্বভৌম দেশ। তাই ভারতের হয়ে তিনি কথা বলতে চান না। তার জানা অনুযায়ী, ভারত বিষয়টিকে নিজেদের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে দেখছে।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কার্যালয় বা কাগজে-কলমে থাকা সংগঠন নয়। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলে দলটির সমর্থক রয়েছে। তার দাবি, কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস মুছে ফেলা যায় না।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেছিল। দলটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলা মামলার সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শেখ হাসিনার বক্তব্য, দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সংগঠিত হওয়া, কথা বলা, প্রচার চালানো ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তার যুক্তি, জনগণ যদি আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে, তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে তা প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার তদন্ত নিয়েও শেখ হাসিনা নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৮ জুলাই তৎকালীন সরকার প্রতিটি মৃত্যু, গুলি ও সহিংসতার ঘটনা তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। পরে কমিশনের পরিধিও বাড়ানো হয়। তার প্রশ্ন, তিনি যদি সত্য গোপন করতে চাইতেন, তাহলে ক্ষমতায় থাকতেই কেন তদন্ত শুরু করতেন।
তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তৎকালীন সরকার সেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বাতিল করে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনটি প্রথমে ১৬ জুলাই গঠন করা হয়েছিল এবং পরে এর সদস্যসংখ্যা ও কাজের পরিধি বাড়ানো হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার ২৩ দিন পর কমিশনটি বাতিল করা হয়।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই তদন্ত বন্ধ করে সত্য প্রকাশের সুযোগ নষ্ট করেছে। তার দাবি, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ঘটনায় যথাযথ ফরেনসিক তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও নথি পরীক্ষা করা হয়নি। তবে জাতিসংঘের পৃথক অনুসন্ধানী দল পরে ২০২৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করে। সেই তদন্তে ২৫০টির বেশি সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন নথি ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্য, ন্যায়বিচার চাইলে আসামিকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। প্রমাণ পরীক্ষা ও সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দিতে হবে। তার মতে, তদন্ত বন্ধ করা বা কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া ন্যায়বিচার নয়।
সবশেষে তাকে প্রশ্ন করা হয়, দেশে ফেরার ক্ষেত্রে ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার প্রত্যাশা কী। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকেই নির্ধারণ করতে হবে। কোনো বিদেশি দেশকে সরকার নির্ধারণ করতে বলছেন না তিনি। তবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা বলার অধিকার রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ভারতের কাছে তার প্রত্যাশা বন্ধুত্ব। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। কিন্তু তার নিজের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারত নয়, বাংলাদেশই তার কাছে প্রধান। কারণ, ভারত বন্ধু হলেও বাংলাদেশ তার মাতৃভূমি।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে শেখ হাসিনা তার দেশে ফেরাকে ব্যক্তিগত মামলার বাইরে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধান হবে, নাকি বর্জন ও প্রতিশোধের মাধ্যমে—তার ওপর।
তবে শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিপরীতে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও দমন-পীড়ন নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে তার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চলা বিচার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার জবাবদিহির বিষয়ও জড়িয়ে আছে।
শেখ হাসিনা অবশ্য সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি দেশে ফিরতে চান। আদালতের মুখোমুখি হতেও প্রস্তুত। কিন্তু তার শর্ত, বিচার হতে হবে বিচার হিসেবে। তার ভাষায়, পূর্বনির্ধারিত শাস্তি নয়। আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিষয়ে তার বক্তব্য আরও স্পষ্ট—তাদের অপরাধী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখার সুযোগ দিতে হবে। ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন তাই দেশের রাজনীতিতে নতুন করে বড় একটি পরীক্ষা তৈরি করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন