ছবি: সংগৃহীত
মোজাম্মেল হোসেন
বড় সংবাদপত্রগুলো সাধারণত হাওয়া বুঝে চলে। কারণ, আত্মরক্ষা তাদের বড় বালাই। তবে সব সময় যে রক্ষা পায়, তা নয়। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার পর খাণ্ডবদাহ তার প্রমাণ। দেশের প্রধান বাংলা সংবাদপত্রটিতে (প্রথম আলো) মুজিবনগর দিবসের খবর দুইয়ের পাতায় সিঙ্গেল কলামে নামাজের সময়ের নিচে মুখ লুকিয়েছে। আরেকটি আইটেম আছে—৫-এর পাতায় একটি ইন্টারেস্টিং সাক্ষাৎকার।
১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উপপ্রধান ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান গোলকবিহারী মজুমদারের আমেরিকা-প্রবাসী কন্যা বাসন্তী মুখার্জির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজিবনগর সরকার তথা স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ।
গোলকবিহারী মজুমদার আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, কেননা তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সীমান্ত থেকে একেবারে নিজ উদ্যোগে ঊর্ধ্বতনদের মাধ্যমে দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাক্ষাৎকারটি কবে, কোথায় নেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে এটি প্রকাশ করা হলো। ততোধিক ইন্টারেস্টিং হলো সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম নির্বাচন। বলা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় ‘ট্রেন্ডি’ শিরোনাম বাছাই করা হয়েছে।
শিরোনামে তাজউদ্দীনের কথিত উক্তিটি বাসন্তী মুখার্জির সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া হয়নি; বরং শারমিনের ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইয়ে গোলকবিহারী মজুমদারের উক্তি বলে তিনি বাসন্তীকে শুনিয়েছেন—সেই অংশ থেকে নেওয়া।
তাজউদ্দীনকন্যা শারমিনের বইগুলো ব্যাপকভাবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমিও সশ্রদ্ধ চিত্তে পড়েছি। কিন্তু ক্রমশ তার কথাবার্তায় এবং বিশেষভাবে জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তার উক্তি ও সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার একটি প্রবণতা লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে। এতে তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে।
তাজউদ্দীন আহমদ ব্যক্তি হিসেবে প্রখর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, আবার অতিশয় মার্জিত স্বভাবের; একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন—এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার ওই উত্তুঙ্গ মুহূর্তে বিনা উস্কানিতে একজন ভারতীয় শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাকে তিনি রূঢ় কণ্ঠে ঐ উক্তি করেছিলেন—তা কি সহজভাবে বিশ্বাসযোগ্য?
উক্তিটি বর্তমানের ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের’ বিরুদ্ধে ‘আজাদির লড়াই’ করনেওয়ালা ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ মনোভাবের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তাই মনে হয়, সাক্ষাৎকারদাতার ভাষ্য ও পুরো সাক্ষাৎকারের মেজাজের সঙ্গে না মিললেও আরোপিত বিচ্ছিন্ন উক্তিটি শিরোনাম করা হয়েছে।
লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন