বুধবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আমলাতন্ত্র জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের বুকে চেপে বসেছে, কিছুই করা যায় না: ফাওজুল কবির খান *** আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র *** ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণমাধ্যমকর্মীদেরই আদায় করতে হবে’ *** নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ‘সিম্প্যাথি’ পেতে মিথ্যা বলছেন: মির্জা আব্বাস *** ড্রোন বানাবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, সহায়তা করবে চীন *** নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসির কাছে ৭১ সংগঠনের ১০ সুপারিশ *** ‘নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে–বিপক্ষে যাবেন না’ *** ‘কাজের টোপ’ দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে বাংলাদেশিদের পাঠানো হচ্ছে যুদ্ধে *** পায়ে পাড়া দিয়ে কেউ যদি আশা করে আমরা চুপ থাকব, তা হবে না: শফিকুর রহমান *** বিচ্ছেদের পর গলায় স্ত্রীর ছবি ঝুলিয়ে দুধ দিয়ে গোসল

আইন উপদেষ্টা যার ভক্ত, তার সরকারের চোখেই তিনি ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, ১০ই জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার দুটি বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্য এবং একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে গত তিনদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে নিয়ে। নেটিজেনেরা নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে অভিযোগ করছেন, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সুযোগ পেলেই অসত্য বলেন। প্রতিবেদন দুটি দৈনিক বণিক বার্তার আর ফেসবুক পোস্টটি আইন উপদেষ্টার।

নতুন করে আরো ২৫২ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স সম্প্রতি দিয়েছে 'আসিফ নজরুলের মন্ত্রণালয়'। প্রতি লাইসেন্সের জন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা (অনুমান নির্ভর) করে ঘুষ ধরা হলে মোট কত টাকার লেনদেন হয়েছে লাইসেন্স দেওয়ার পেছনে, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেক নেটিজেন। এদিকে ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের পাশাপাশি যে গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে, আমেরিকানদের কাছে একযুগ আগেই এই গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন আলী রীয়াজ।

নেটিজেনেরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আলী রীয়াজ কোনো 'মিশন' নিয়ে, বা বিদেশ থেকে কোনো গোষ্ঠীর 'উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে' দেশে এসেছেন কী না, তা খতিয়ে দেখার যে চেষ্টা গত বছর করবেন বলে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছিলেন গণমাধ্যমে, তাদের সেই উদ্যোগ যথাযথ ছিল।

'জামায়াতপন্থী' হিসেবে পরিচিত আইন উপদেষ্টা নিজের এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে দাবি করেছেন, তিনি বিএনপির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভক্ত ছিলেন। নেটিজেনেরা বলছেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রথম সরকারের আমলে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহের' মামলা হয়েছিল। 'ভক্তের' বিরুদ্ধে সরকার এই মামলা দায়ের করেছিল কেন? এমন আলোচনার পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক মাধ্যমে গত দুই-তিন দিন ধরে বেশ সরব থাকতে দেখা গেছে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের।

গতকাল শুক্রবার (৯ই জানুয়ারি) বণিক বার্তার ছাপা সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, 'নতুন করে আরো ২৫২ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দিয়েছে আসিফ নজরুলের মন্ত্রণালয়' শিরোনামে। এতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশে। এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ ছিল বর্তমান সরকারের গঠিত অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির। এরপরও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন করে আরো ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দিয়েছে—যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ খাতে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা তৈরির অভিযোগ ছিল। এমনকি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ কার্যক্রমে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় রাজনৈতিক যোগসাজশে অনেক এজেন্সি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে, যারা কর্মী প্রেরণে সিন্ডিকেট তৈরি ও বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিল।

যদিও নতুন ২৫২ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স কী প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে, এজন্য কত টাকার লেনদেন হয়েছে, বা এতে মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আদৌ জড়িত কিনা, এসব বিষয়ে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ নেই।

তবে 'অভিজ্ঞ' নেটিজেনেরা দাবি করছেন, দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দেওয়া ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থা এখনো রয়ে গেছে। তেমন পরিবর্তন আসেনি। অনুমান নির্ভর ঘুষ নেওয়ার আলোচনায় মন্ত্রণালয়কে জড়ানো কোনোভাবেই নৈতিক নয়, এমন কথাও বলছেন অনেক নেটিজেন।

অনেকে বলছেন, দেশের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ খাতে সরকারের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ না থাকা এবং সুশাসনের অভাবে একদিকে বিদেশগামী বাংলাদেশী নাগরিকেরা প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন; অন্যদিকে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মানে অবনমন ঘটছে, জটিল হয়ে উঠছে বিভিন্ন দেশের ভিসাপ্রাপ্তি।

গত বৃহস্পতিবার (৮ই জানুয়ারি) গভীর রাতে ফ্রেন্ডস প্রাইভেসি করা এক পোস্টে আসিফ নজরুল সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সাংবাদিক হিসেবে খালেদা জিয়ার একাধিক সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ব্যক্তিত্বের নানা দিক পোস্টে তুলে ধরেন তিনি।

নিজেকে খালেদা জিয়ার ‘ভক্ত’ উল্লেখ করে পোস্টে আসিফ নজরুল জানান, 'শেখ হাসিনা সরকারের পুরো সময়েও বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও সমর্থন অবিরত ছিল। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলে কোনোদিন আমি এই শ্রদ্ধা আর সমর্থন প্রকাশে বিরত ছিলাম না।'

নেটিজেনেরা বলছেন, শেখ হাসিনার গত সরকারের আমলে আসিফ নজরুল যখনই খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতেন, তখন অপ্রাসঙ্গিকভাবে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে তার প্রশংসা করতেন। এর মাধ্যমে তিনি বক্তব্যে 'ব্যালেন্স' করতেন। 'ভক্ত' হলেও খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে (১৯৯১-৯৬)  আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহের' মামলা দায়ের করেছিল ওই সরকার।

আসাদুজ্জামান খান নামে এক নেটিজেন আসিফ নজরুলের পোস্ট সম্পর্কে নিজের ফেসবুকে মন্তব্য করেন, সুযোগ পেলেই এই উপদেষ্টা অসত্য বলেন। ২০১১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত টকশো ‘ফ্রন্টলাইনে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছিলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একাত্তর সালে যুদ্ধাপরাধে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। কারণ তিনি তখন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

আসাদুজ্জামান খান লেখেন, 'জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছিল জামায়াতপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও লেখক আসিফ নজরুলের একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১০ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। যে প্রতিবেদনে আসিফ নজরুল সাঈদীর উত্থান, পরিচয় গোপন, ধর্মব্যবসা, আর্থিক অসততা, যুদ্ধাপরাধসহ স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন। আদর্শ পালটে আসিফ নজরুল বর্তমানে জামায়াতঘনিষ্ঠ লোক। অথচ এই আসিফ এক সময় ছিলেন শহিদ জননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সংগঠক।'

গত বৃহস্পতিবার বণিক বার্তার ছাপা সংস্করণের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, 'মার্কিনদের কাছে একযুগ আগেই গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন আলী রীয়াজ'।

এতে বলা হয়, '২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারাসহ আরো অনেকেই বাংলাদেশের প্রধান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করেছিল। একই ইস্যুতে বৈঠক করেছিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সাবকমিটি। ২০১৩ সালের ২০শে নভেম্বর ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এশিয়া ও প্যাসিফিক-বিষয়ক সাবকমিটির শুনানিতে গণভোটের প্রস্তাব তুলে ধরেন ড. আলী রীয়াজ।'

সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের প্রতিক্রিয়া জানানো নিয়ে বিএনপিকে গত বছর যে পরিকল্পিতভাবে উভয়সংকটের মুখোমুখি করা হয়েছিল, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে বলে মনে করে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। তখন থেকে ড. আলী রীয়াজের কার্যক্রম, গতিবিধি নতুন করে পর্যবেক্ষণ করে তারা। ঐকমত্য কমিশনের শীর্ষ পদে বসে দেশি-বিদেশি বিএনপি বিরোধী কোনো গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে আলী রীয়াজের যোগসাজশ আছে কী না, এর তত্ত্বতালাশ করে তারা।

তারা বলছেন, নব্বইয়ের দশকের শুরু ও শেষের দিকে ভারতের বিতর্কিত সংগঠনের অর্থায়নে ঢাকা থেকে দুটি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয় বলে অভিযোগ আছে। ওই দুটি পত্রিকায় কলাম লেখার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন আলী রীয়াজ। একটি বিশেষ গোষ্ঠী পত্রিকা দুটির মাধ্যমে তাকে নতুন করে পরিচিত করায়। পত্রিকা দুটির সম্পাদকীয় নীতিমালাকে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো সবসময়ই সন্দেহের চোখে দেখে। ছাত্রজীবনে আলী রীয়াজ পর্যায়ক্রমে দুটি বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আসিফ নজরুল আলী রীয়াজ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250