ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে ভাইরাসবাহিত রহস্যজনক এক রোগের সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুরুতে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব বলে মনে করা হলেও, এটি আসলে আরেকটি নতুন ও সম্ভাব্য প্রাণঘাতী বাদুড়বাহিত ভাইরাসের কারণে হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় এমন সতর্কবার্তাই দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে পাঁচজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের উপসর্গের মধ্যে ছিল—জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ এবং স্নায়বিক সমস্যা।
এই পাঁচজন রোগীই কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। খেজুরের এই মিষ্টি রস বাদুড়েরও পছন্দের খাদ্য। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বাদুড়কে একটি পরিচিত বাহক হিসেবে ধরা হয়। তবে এই পাঁচজনের কেউই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না—পরীক্ষায় সবার ফল নেগেটিভ আসে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোগীরা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। কিন্তু তাদের মধ্যে তিনজন দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, শ্বাস নিতে অসুবিধা এবং হাঁটাচলায় সমস্যার কথা জানান। তাদের একজনের স্বাস্থ্য অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হয় এবং অজানা স্নায়বিক জটিলতায় ২০২৪ সালে তার মৃত্যু হয়।
এখন বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই রোগীরা আসলে প্টেরোপাইন অরথোরিওভাইরাসে (পিআরভি) আক্রান্ত ছিলেন। এটি বাদুড়বাহিত আরেকটি ভাইরাস। এর আগে—জানা ছিল, বাদুড় বহু প্রাণঘাতী জুনোটিক ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার। এর মধ্যে রয়েছে র্যাবিস, নিপাহ, হেন্দ্রা, মারবার্গ এবং সার্স। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে পিআরভি সংক্রমণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে মৃদু ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে পাওয়া এই নতুন ঘটনাগুলোতে চিত্র ভিন্ন।
গবেষকেরা বলেন, ‘পাঁচজন রোগীর সবারই তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও স্নায়বিক উপসর্গ ছিল। অথচ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে পিআরভি সংক্রমণ সাধারণত মৃদু শ্বাসতন্ত্রের অসুখের সঙ্গে যুক্ত ছিল।’ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজ জার্নালে।
গবেষকদের ধারণা, ভাইরাসটির জিনগত কাঠামোয় পুনর্বিন্যাস (রিঅ্যাসর্টমেন্ট) ঘটেছে। এর ফলে ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতা ও রোগ সৃষ্টির তীব্রতা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। এই নতুন গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে শনাক্ত হওয়া জুনোটিক ভাইরাসের তালিকায় পিআরভিকে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিপাহর মতো উপসর্গ দেখা দিলে রোগ নির্ণয়ের সময় পিআরভিকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
গবেষণার অন্যতম লেখক নিশ্চয় মিশ্র বলেন, ‘আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে যে কাঁচা খেজুরের রস পান করার কারণে রোগের ঝুঁকি শুধু নিপাহ ভাইরাসেই সীমাবদ্ধ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি নতুন ও উদীয়মান বাদুড়বাহিত ভাইরাস থেকে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলায় বিস্তৃত নজরদারি কর্মসূচির গুরুত্বও তুলে ধরে।’
গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, পদ্মা নদীর অববাহিকার কাছে পাঁচটি মানব সংক্রমণের ঘটনার আশপাশে ধরা পড়া বাদুড়ের মধ্যেও জিনগতভাবে মিল থাকা পিআরভি শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণার আরেক লেখক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখন বাদুড় থেকে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীতে ভাইরাস ছড়ানোর প্রক্রিয়া, পাশাপাশি পদ্মা নদীর অববাহিকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ে উদীয়মান বাদুড়বাহিত ভাইরাসের সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব বোঝার জন্য কাজ করছি।’
যেসব এলাকায় কাঁচা খেজুরের রস পান করা হয়, সেখানে গবেষকেরা শ্বাসতন্ত্রের রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পিআরভি, নিপাহ ভাইরাস (এনআইভি) এবং অন্যান্য বাদুড়বাহিত ভাইরাসের পরীক্ষাকে চিকিৎসা নজরদারি ও রোগ নির্ণয়ের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন