ছবি: সংগৃহীত
শংকর মৈত্র
গত ৭ই জানুয়ারি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার শুনানির সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকেরা নিত্যদিনের মতো প্রবেশ করতে চাইলে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আদালতের নিরাপত্তারক্ষীরা সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেন। এ সময় সাংবাদিকেরা কারণ জানতে চাইলে তাদের বলা হয় সাংবাদিকেরা প্রবেশ করতে পারবেন না। উপর থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
উপরের কে নিষেধ করেছেন, জানতে চাইলে সেটা জানানো হয়নি। সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া রিপোর্টাররা বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি সুস্পষ্ট কোনো জবাব দেননি। সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে কোনো ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ল' রিপোর্টার্স ফোরাম, সংক্ষেপে যা এলআরএফ। এর নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে কথা বললে তিনি তাদেরও সন্তোষজনক কোনো জবাব দেননি।
বিষয়টি নিয়ে একটা লুকোচুরি চলছে। সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো লিখিত আদেশ যেমন দেওয়া হয়নি, তেমনি কর্তৃপক্ষ থেকে মৌখিক আদেশও দেওয়া হয়নি। কোর্ট রুমের নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু কেনো এমনটা করা হলো?
এর দু'দিন আগে ৫ই জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর থেকে সাংবাদিকদের সতর্ক করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। রেজিষ্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, “সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করায় আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এবং বেঞ্চ প্রদান না করায় হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি ছুটিতে গিয়েছেন- এরূপ ভুল সংবাদ টিভি স্ক্রলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে অসত্য, বিভ্রান্তকর ও অত্যন্ত দুঃখজনক।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় “গণমাধ্যমে এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে জনমনে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।” এছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন আদালত অবমাননার শামিল।
সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের আগে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীরা যদি সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে সংবাদের যথার্থতা যাচাই করতেন, তাহলে এ ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম তার মায়ের অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটি গ্রহণ করেছেন। আর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ অসুস্থতাজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সাময়িকভাবে বিচারকার্যে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।
সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের আগে সুপ্রিম কোর্টের মিডিয়া ফোকাল পার্সন অথবা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা যাচাই করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসত্য সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আদালত অবমাননাকর কার্যক্রমের জন্য আইনানুগভাবে দায়ভার গ্রহণ করতে হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। গণমাধ্যমের প্রতি রেজিস্ট্রার জেনারেলের এই সতর্কবার্তা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে।
মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশ করা অবশ্যই অপরাধ এবং এ ধরনের ঘটনা যে পত্রিকা বা টেলিভিশন বা অনলাইন করবে আইন অনুযায়ী অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতো কারো আপত্তি থাকার কথা না। সাংবাদিকেরাও এর প্রতি সমর্থন জানান। কিন্তু ব্যক্তির অপরাধ পুরো কমিউনিটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া কি যায়?
এই বিজ্ঞপ্তি জারির একদিন পরই আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরদিন আবারো সংবাদ সংগ্রহে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের অন্যতম এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা কেবল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না, বরং তা সাধারণ মানুষের কাছে স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ব্রিটিশ আইনবিদ লর্ড হিউয়ার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি— “Justice should not only be done, but should manifestly and undoubtedly be seen to be done” (ন্যায়বিচার শুধু হলেই হবে না, তা যে হচ্ছে সেটা দৃশ্যমানও হতে হবে)—আজও বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কিন্তু গত ৭ই জানুয়ারি আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে, তা বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
৭ই জানুয়ারি নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রবেশের চেষ্টা করলে সাংবাদিকদের বাধা দেন আদালতের নিরাপত্তারক্ষীরা। কোনো লিখিত আদেশ ছাড়াই মৌখিকভাবে জানানো হয় যে, "উপরের নির্দেশে" সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের পরিপন্থী এই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, তেমনি বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত, যেখানে সংবিধানের ব্যাখ্যা ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়। সেখানে সংবাদকর্মীদের অনুপস্থিতি বিচারিক প্রক্রিয়াকে জনবিচ্ছিন্ন করার নামান্তর।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের কার্যক্রম সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা সেই স্বাধীনতারই অংশ। আদালত কোনো ব্যক্তিগত কক্ষ নয়; এটি একটি পাবলিক প্লেস বা উন্মুক্ত স্থান।
বিশেষ কিছু স্পর্শকাতর মামলা (যেমন ইন-ক্যামেরা ট্রায়াল) ব্যতীত আদালতের সকল কার্যক্রম জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার অর্থ হলো জনগণের জানার অধিকারকে খর্ব করা।
আদালতের প্রতিটি রায় ও পর্যবেক্ষণ সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। সাংবাদিকেরা সেই পর্যবেক্ষণগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করেন। যদি আপিল বিভাগের দরজা সাংবাদিকদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে আদালতের কার্যক্রম নিয়ে ভুল তথ্য বা অপপ্রচার ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্বচ্ছতা বজায় না থাকলে বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। "উপরের নির্দেশ" নামক অদৃশ্য অজুহাত বিচার বিভাগের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনোই কাম্য নয়।
আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আদালতের কার্যক্রম কেবল সাংবাদিকদের জন্যই উন্মুক্ত নয়, বরং অনেক দেশে বিচারিক কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার (Live Streaming) করা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে যাতে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়ে।
আমাদের আপিল বিভাগেও একবার বিচারকার্যক্রম সরাসরি আদালতের ওয়েব সাইটে প্রচার করা হয়েছিল।
এ ছাড়া সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায় বিটিভিতে সরাসরি প্রচার করা হয়।
সেখানে আপিল বিভাগ হঠাৎ উল্টো পথে হেঁটে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া বা প্রবেশে বাধা দেওয়া একটি পশ্চাৎপদ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়ের স্থল। সেই আশ্রয়ের আঙিনায় যদি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। ৭ই জানুয়ারির ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই থাকবে, নাকি এটি স্থায়ী কোনো নীতি হতে যাচ্ছে—তা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দ্রুত স্পষ্ট করা উচিত।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী গত ২৮শে ডিসেম্বর নিযুক্ত হন। তিনি স্বনামধন্য বিচারক। আইনজীবী থেকে তিনি হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে অভিষিক্ত হন।
২০২৪ এর পাঁচ আগষ্টের পর তিনি আপিল বিভাগে নিয়েগ পান। ২৮শে ডিসেম্বর তিনি দেশের প্রধান বিচারপতি হন। তার কাছে সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা, তিনি এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে আদালতের উন্মুক্ত পরিবেশ এবং গণমাধ্যমের অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করবেন। কারণ, রুদ্ধদ্বার আদালত কখনোই ন্যায়বিচারের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটাতে পারে না।
বিচার বিভাগের মর্যাদা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। এই দুইয়ের মধ্যে দেয়াল তোলা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র এবং জনগণ। আমরা আশা করি, আপিল বিভাগের দরজা সাংবাদিকদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হবে এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার শুনানির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। সাংবাদিকেরা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আদালতের কার্যক্রম কভার করতে আপিল বিভাগে প্রবেশ করতে চাইলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের বাধা দেন।
কারণ জানতে চাইলে জানানো হয়—‘উপরের নির্দেশ’ অনুযায়ী সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই ‘উপরের নির্দেশ’ কোথা থেকে এলো, কেন এলো, কতদিনের জন্য এলো—এসব প্রশ্নের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তখনও দেওয়া হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ, বিভ্রান্তি এবং নানা ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি এর কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকারও মৌলিক। গণমাধ্যম সেই জানার অধিকার বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যম। আদালতের দরজা যদি কার্যত গণমাধ্যমের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেটি কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের সীমাবদ্ধতা নয়—তা জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকেও সংকুচিত করে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক ফোরাম; এখানকার সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নাগরিক জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে এ বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহে বাধা মানে জনস্বার্থ বিঘ্ন হওয়া। আশা করি সর্বোচ্চ আদালত জনস্বার্থের দিকটিই বিবেচনা করবেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট; প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ল' রিপোর্টার্স ফোরাম, এলআরএফ।
খবরটি শেয়ার করুন