ছবি: সংগৃহীত
‘আমার স্বামী মারা গেছে তিন মাস হইলো। অনেক কষ্টে দুইটা মেয়েরে বিয়া দিছি। আগে তো ভোগাই নদী থাইকা পাথর তুইলা বিক্রি কইরা দিন চালাইতাম। অহন তো নদীতে পাথরও নাই। আল্লাহ আমার শেষ সম্বলটারেও এভাবে নষ্ট কইরা দিল। অহন তো আমার আর কোনো পথ নাই।’
কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে মনোয়ারা বেগমের। স্বামী মারা গেছেন তিন মাস আগে। অনেক কষ্টে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সংসারের খরচ মিটিয়ে সামান্য সামান্য করে প্রায় ১০ বছর ধরে টাকা জমিয়েছিলেন তিনি ও তার স্বামী। সেই সঞ্চয় একসময় দাঁড়ায় ২ লাখ টাকায়। নিরাপদ ভেবে টাকাগুলো রাখা হয়েছিল একটি জর্দার কৌটায়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় কৌটাটি খুলে দেখলেন, দীর্ঘদিনের সেই সঞ্চয় ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে।
মনোয়ারা বেগম শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মনোয়ারা বেগম ভোগাই নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করতেন। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত তাদের সংসার। সেই আয় থেকেই অনেক কষ্টে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তারা।
সংসারের খরচ মেটানোর পর ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন মনোয়ারা ও জিয়া উদ্দীন। খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের সঞ্চয় বাড়তে থাকে। প্রায় আট মাস আগে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ টাকা। পরে টাকাগুলো একটি জর্দার কৌটায় রেখে দেন মনোয়ারা।
এরপরই আসে বড় ধাক্কা। প্রায় তিন মাস আগে মারা যান জিয়া উদ্দীন। স্বামীর মৃত্যুর পর মনোয়ারার সংসারে আরও কঠিন সময় নেমে আসে। জীবিকার জন্য যে ভোগাই নদীতে বালু-পাথর তুলতেন, সেখানেও এখন আগের মতো পাথর নেই। ফলে সেই কাজ থেকেও আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
সম্প্রতি টাকার প্রয়োজন হলে জর্দার কৌটাটি বের করেন মনোয়ারা। কিন্তু কৌটার মুখ কোনোভাবেই খুলতে পারছিলেন না। পরে বাধ্য হয়ে কৌটার মুখ কেটে ভেতরের টাকা বের করেন। তখনই চোখে পড়ে ভয়াবহ দৃশ্য—কৌটার ভেতরে থাকা টাকাগুলো ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় আর ব্যবহার করার মতো নেই।
আজ রোববার সকালে নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। শেষ সম্বল হারানোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। মেয়েগো বিয়া দিছি অনেক কষ্টে। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?’
মনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘ভোগাই নদী থাইকা আগে বালু-পাথর তুইলা বিক্রি কইরা সংসার চালাইতাম। অহন নদীতে পাথরও নাই। স্বামীও নাই। শেষ সম্বলটাও নষ্ট হইয়া গেল। আল্লাহ আমার আর কী রাখছে, জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, ‘মনোয়ারা ও তার স্বামী জিয়া দুজনই খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতেন। জিয়ার মৃত্যুর পর অভাবের সংসারে টাকা নষ্ট হওয়ার কথা শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তাদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। মনোয়ারা এখন শুধু কাঁদেন।’
প্রতিবেশী সাদ আল জুনায়েদ বলেন, দীর্ঘদিন কষ্ট করে সঞ্চয় করা এই টাকা মনোয়ারা বেগমের কাছে শুধু অর্থ ছিল না; ছিল স্বামীর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। সেই সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
খবরটি শেয়ার করুন