হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার গম্বুজ। ছবি: এএফপি
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩৯ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমা নগরীতে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে আমেরিকা। 'লিটল বয়' নামের এই পারমাণবিক বোমায় নিহত হন অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। এত বছর পার হয়ে গেলেও ভয়াল সেই দিনের কথা এখনো ভোলেননি জাপানের মানুষ।
১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট প্রতিদিনের মতো জাপানিরা দিনের কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার জন্যে ছুটছিলেন আপন গতিতে। জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষদের তাড়া করছে মৃত্যুদূত, এ কথা কেউ জানতেন না। জানার কথাও নয়।
প্রাণচাঞ্চল্যের শহর হিরোশিমা। আমেরিকার অ্যালোনা গাই বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে হিরোশিমা শহরে আণবিক বোমা (অ্যাটম বোমা) ফেলা হয়। মানব সভ্যতা যেন হোঁচট খেয়ে সেদিন থমকে দাঁড়ায় এখানে!
বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা ১৯৩৯ সালের। পৃথিবীতে তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে তৎকালীন জার্মানির এডলফ হিটলারের গলাবাজিতে সারা বিশ্বের মানুষ আশঙ্কা করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। পশ্চিমা বিশ্ব হিটলারের আণবিক বোমাপ্রাপ্তির একচেটিয়া অধিকারী হয়ে সারা বিশ্বের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার গোপন খবরে তটস্থ হয়ে পড়ে।
ঠিক এমন সময়ে আমেরিকায় শরণার্থী হিসেবে বসবাসকারী, হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী ড. লিও জিলার্ড প্রথম আণবিক বোমা তৈরির জন্যে একটি প্রস্তাব দেন আমেরিকার তখনের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে।
হিরোশিমার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা। পরপর তিনবার সর্তক সাইরেন বেজে ওঠে। ভীত সন্ত্রস্ত হিরোশিমাবাসী আকাশের অনেক উঁচুতে কয়েকটি যুদ্ধবিমান চক্কর দিতে দেখেন। একটু পরে এদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিমান। কিছুক্ষণ পর বিমানগুলো দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়। সময় তখন আনুমানিক সকাল সাড়ে ৭টা। বিপদমুক্ত সাইরেন বেজে ওঠে। হিরোশিমাবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন।
কিন্তু, ৮টায় আবার তিনটি বিমান আকাশে আবির্ভূত হয়। এবার এটাকে মামুলি বিমান বিবেচনা করে আর কোনো সাইরেন বাজানো হয়নি। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেলই ঘটে যায় বিভীষিকা। হিরোশিমায় প্রলয় সৃষ্টিকারী ইউরেনিম বোম লিটর বয় (Little Boy)-এর দৈর্ঘ্য ছিল ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি, ব্যাস ২৯ ইঞ্চি, ওজন ৯৭০০ পাউন্ড।
১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর। জাপান সরকার আমেরিকার পার্ল হারবার বিমান এবং নৌঘাঁটিতে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে সব কিছু তছনছ করে দেয়। চোখের পলকে সেখানে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর জাপানের উপর আঘাত হানার পরিকল্পনা আটলো আমেরিকা। সুদে-আসলে বদলা নেওয়ার জন্যে কৌশল অবলম্বন করতে থাকলো। আমেরিকা আগের দুই বৈজ্ঞানিকের আণবিক বোমা বানানোর প্রস্তাব বিবেচনায় এনে চূড়ান্তভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৪৫ সালের ৮ই মে। জার্মানির আত্মসমর্পণের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলেও অন্য শক্তি জাপান তখনও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। এতে তখন এটাই প্রতীয়মান হয়েছিল, আমেরিকা যে আণবিক বোমা তৈরি করেছে, তার লক্ষ্যবস্তু জাপান।
প্রসঙ্গত, পনেরো শতকে হিরোশিমা ছিল একটি জরাজীর্ণ গ্রাম। ১৬ শতকে মরিক্লান হিরোশিমায় একটি মন্দির নিমার্ণের মাধ্যমে উন্নয়নের বীজ বপন করেন। তখন থেকেই মূলত হিরোশিমা শহরটি ছিল জাপানের চুগকু-শিককু জেলার সবচেয়ে বড় মন্দিরের শহর। দীর্ঘকাল ধরে গরে ওঠা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নসমৃদ্ধ হিরোশিমা বোমার আঘাতে হয় বিরাণভূমি। ধ্বংসস্তুপ হিসেবে হিরোশিমা পরিচিতি লাভ করে পৃথিবীর সর্বত্র।
মানব ইতিহাসে পারমাণবিক বোমার প্রথম শিকার হিরোশিমা। আর তাই এই মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনার দিনটি আজও বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয়। জপানের রাজধানী টোকিওর দক্ষিণ-পশ্চিমে ৬শ’ ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে হিরোশিমা শহরের অবস্থান। ধ্বংসের পর সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি অতিক্রম করে হিরোশিমা আবার দাঁড়িয়েছে অগ্রগতির প্রতীক হয়ে। বর্তমানে এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় ১.৮৮ মিলিয়ন।
অটোমোবাইল ইস্পাত, প্রকৌশল, জাহাজ মেরামত, খাবার প্রক্রিয়াকরণ ও আসবাবপত্র শিল্পে শহরটি এখন বিশ্বের দরবারে যথেষ্ট সমাদৃত। বলা হয়ে থাকে, হিরোশিমা উপসাগর ঝিনুকের আঁধার হিসেবে বিখ্যাত আর স্নানের ক্ষেত্র হিসেবে জাপানি সংস্কৃতির ধারক। আনুমানিক ৩’শ বছরেরও বেশি কাল আগে থেকে জাপানে উৎপাদিত ঝিনুকের সিংহভাগের উৎসই এই হিরোশিমা উপসাগর।
এখন আর সেখানে বোঝার উপায় নেই যে, এই হিরোশিমা শহরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিশ্ব মানবতার সমস্ত অহংকার। সৃষ্টি হয়েছিল বর্বরতা আর হিংস্রতার চুড়ান্ত ইতিহাস। আজ হিরোশিমার আকাশের নির্মল আভা, বাতাসের স্বচ্ছ আমেজ, সর্বত্র কবুতরের শান্তির সমাবেশ আর শিশুদের আনন্দ উল্লাসে বোঝার কোনো উপায়-ই নেই যে, এই হিরোশিমাই এককালে পরিণত হয়েছিল বিধ্বস্ত মরুভূমিতে।
বলা বাহুল্য, হিরোশিমা এখন শান্তিময় শহর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এখানের অনেক মানুষ এখনো নীরবে বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই ঘাতক পারমাণবিক বোমার বিষ। ক্রমান্বয়ে মৃত্যু যেন তাদের স্বাগত জানাচ্ছে! অনিচ্ছা সত্বেও মানুষ এখনো ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্টের তাণ্ডবলীলার দুঃসহ স্মৃতি। এসব স্মৃতি চিহ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে হিরোশিমার শান্তি রক্ষার প্রতীক শান্তি স্মৃতি পার্ক। এটি জানাচ্ছে শাশ্বত শান্তি রক্ষার আহ্বান। এই পার্কে আছে স্মৃতি জাদুঘর ও বহু স্মৃতি স্তম্ভ।
প্রতি বছর ৬ই আগস্ট এখানে পালিত হয় স্মৃতি উৎসব। শান্তি স্মৃতি পার্ক সংলগ্ন কয়েকটি স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। এগুলোর মধ্য একটি হচ্ছে আণবিক বোম ডোম। এটি ছিল হিরোশিমা শিল্প উন্নয়ন হল। বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছিল প্রায় পুরোটা। কিছু অংশ এখনো দাঁড়িয়ে আছে বিমূর্ত সাক্ষী হিসেবে। হলের বিধ্বস্ত কাঠামোটি টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রচুর অর্থ।
অন্য আরেকটি স্মৃতি হচ্ছে শান্তির শিখা। শান্তি স্মৃতি পার্কের পেছনে একটি আয়তাকার পুকুর। পুকুরটির নাম শান্তি পুকুর। পুকুরটির ঠিক উত্তর পাড়ে শান্তির শিখা। এই শিখা বিরামহীনভাবে জ্বলছে। শিখা প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে জাপান পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের জন্য বিশ্ববাসীর দরবারে আহবান জানাচ্ছে।
এছাড়াও একটি স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। সেটি হচ্ছে সেম্বা গুরু। কাগজের তৈরি অসংখ্য সারস পাখির সমাবেশ-সমৃদ্ধ এই স্তম্ভ। সারস পাখিগুলো যেন সর্বদা প্রর্থনারত। বোমার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত এক কিশোরীর জীবনাবসানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত ওই স্তম্ভ। শান্তি স্মৃতি পার্কের কেন্দ্রে আছে পারমাণবিক বোমা মেমেরিয়াল স্মৃতিশালা।
এখানে ৪৪টি বইতে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তায় রোগাক্রান্ত ১ লাখ ২৪ জনের নাম লেখা আছে। ভেতরে রয়েছে একটি মাটির প্রকোষ্ঠ। প্রকোষ্ঠে একটি কালো পাথরের কফিন। সেই কফিনে রাখা আছে বইগুলো।
কফিনের সম্মুখভাগে লেখা, 'এখানে সব আত্মাকে শান্তিতে ঘুমাতে দাও; আমরা যেন আবার এমন ক্ষতি না করি।' হিরোশিমা দিবসে হিরোশিমা ধ্বংসের স্মৃতি চিহ্নগুলো যেন নিঃশব্দে আহ্বান জানাচ্ছে বিলুপ্ত হোক পারমাণবিক অস্ত্র, পৃথিবী হোক শান্তিময়...।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
jsb.shuvo@gmail.com
খবরটি শেয়ার করুন