ছবি: সংগৃহীত
চাঁদাবাজি, হামলা ও হত্যার হুমকির অভিযোগে করা মামলায় কারাগারে পাঠানো সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি মো. নজরুল ইসলামের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়েছেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। হাজি নজরুলের গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে শ্যামনগরবাসীকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন গাজী নজরুল ইসলাম। এর আগে তার ব্যক্তিগত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও একই অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে পোস্ট করেছিলেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম লেখেন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ‘দুবারের সফল চেয়ারম্যান’ হাজি নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার নয়, হাইকোর্টের দেওয়া জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো এবং তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা মুখরোচক অপপ্রচার’ প্রতিপক্ষের ‘কঠিন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ফল’। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে।
এ ধরনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্যামনগরবাসীকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সংসদ সদস্য বলেন, তা না হলে ভবিষ্যতে শ্যামনগরে ন্যায় ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের উদ্ভব কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে হাজি নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারে চাঁদা দাবি, প্রকল্পের কাজে বাধা, হামলা এবং হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন হাজি নজরুল।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্যামনগরে জাইকার অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে আর-রাদ করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন গত ২৫ মে রাতে শ্যামনগর থানায় মামলাটি করেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি মো. নজরুল ইসলামকে। তিনি শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ ও শুরা সদস্য বলেও মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় তার ছেলে আব্দুর রহমান, স্থানীয় বিশ্বজিৎ মণ্ডলসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল এবং চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে গত ১৪ এপ্রিল থেকে প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর গত ১৯ মে রাতে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে হাজি নজরুল ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং চাঁদা না দিয়ে কাজ চালিয়ে গেলে প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২৩ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর করা হয়। তাকে রক্ষা করতে গেলে কিউরিং ম্যান ফেরদৌসকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় প্রকৌশলী জাহিদের একটি অ্যাপল স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাজি নজরুলের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি অভিযোগগুলোকে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। হামলার অভিযোগের সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট অধিবেশনে ছিলেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
মামলার পর উচ্চ আদালত থেকে হাজি নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগী বিশ্বজিৎ মণ্ডল ছয় সপ্তাহের জামিন পান। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে গত ১০ আগস্ট তারা সাতক্ষীরার আদালতে হাজির হয়ে পুনরায় জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে সাতক্ষীরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের এই আদেশ নিয়েই নিজের ফেসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্যে হাজি নজরুলের বিরুদ্ধে চলমান মামলাটিকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ ও মামলার নথিতে থাকা বক্তব্যের সত্যতা বিচারাধীন।
এ বিষয়ে ঢাকায় বসে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেওয়া, চাঁদা দাবি ও হামলার অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে হাজি নজরুলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হচ্ছে।
গাজী নজরুল ইসলামের ফেসবুক পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ সংসদ সদস্যের অবস্থানকে রাজনৈতিক সহমর্মিতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, কোনো মামলায় আদালতের সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে বিচারিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
রাকিব হাসান নামে এক নেটিজেনের মন্তব্য, ‘অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত ও বিচার হোক, আর মিথ্যা হলে যারা মামলা করেছেন তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।’ ‘সুমাইয়া রহমান’ নামে আরেকজন লেখেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধির পক্ষে সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মামলার অভিযোগের বিচার আদালতেই হওয়া উচিত।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বিতর্কের মধ্যেই হাজি নজরুলের কারাবাস এবং তাকে নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের প্রকাশ্য অবস্থান শ্যামনগরের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে মামলার অভিযোগের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগোবে, অন্যদিকে হাজি নজরুলের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হচ্ছে। ফলে শেষ পর্যন্ত মামলার অভিযোগের সত্যতা কীভাবে নির্ধারিত হয়, সেটিই এখন মূল বিষয়।
খবরটি শেয়ার করুন