ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
শিতাংশু ভৌমিক অংকুর
রাষ্ট্রীয় বীরত্বসূচক খেতাব কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবনের পুরস্কার নয়। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রদর্শিত সাহস ও অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেই কারণেই বীর উত্তমের মতো খেতাব আইন, গেজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দেওয়াও যায় না, নেওয়াও যায় না। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে এই খেতাবই বারবার দলীয় রাজনীতির টানাপোড়েনে পড়েছে, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে একক সম্পদ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তার অংশ হিসেবে ২০২১ সালের ১৪ই মার্চ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের(জামুকা) বৈঠকে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিলের যে সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল, সেটি ছিল একটি সুপারিশমাত্র।
আইনি বাস্তবতায় খেতাব বাতিল হয় তখনই, যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর সরকারি গেজেটে তা প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়েই দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে যেন খেতাবটি ইতোমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে, যেন জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
খেয়াল করলে দেখা যায়, খেতাব বাতিলের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—সংবিধান লঙ্ঘন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশত্যাগে সহায়তা কিংবা রাষ্ট্রীয় পদায়ন। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়: মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরত্বের জন্য দেওয়া খেতাব কি যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বাতিল করা যায়? যদি যায়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি আর রাজনৈতিক বিচার এই দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বিগত সরকার খেতাবকে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। আইনি বাতিলের ঝুঁকি না নিয়ে তারা বেছে নিয়েছিল আরও কার্যকর পথ। পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও সরকারি ভাষ্য থেকে ধীরে ধীরে একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কাগজে খেতাব থাকলেও বাস্তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হয়ে উঠে নীরব।
এখানেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বোধের প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল ইতিহাসের এই রাজনৈতিক বিকৃতিকে স্পষ্ট করা। তারা চাইলে খুব সহজেই বলতে পারত জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত আইনি চূড়ান্ততা পায়নি এবং মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। কিন্তু তারা তা বলেনি।
এই নীরবতা তাই প্রশ্ন তোলে। এটি কি কেবল প্রশাসনিক অসতর্কতা, নাকি সচেতন রাজনৈতিক হিসাব? বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে চাপে রেখে দেওয়ার কৌশল? নাকি অন্য কিছু একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যে আওয়ামী লীগ ছাড়া একাত্তরের আর কোনো বড় স্টেকহোল্ডার ছিল না?
এই ধারণা ইতিহাসের সঙ্গে যেমন অন্যায়, তেমনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুমাত্রিক। সেখানে ছিল সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্স, কে ফোর্স, এস ফোর্সসহ গেরিলা যোদ্ধা, গ্রামগঞ্জের মানুষ- সবার মিলিত সংগ্রাম। একটি দল ক্ষমতায় থেকে যদি ইতিহাসকে সংকুচিত করে, আর পরিবর্তনের পর গঠিত সরকার যদি সেই সংকোচনের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই ইতিহাসের দায় এড়ায়।
আজ বিতর্কটা কোনো একটি খেতাব নিয়ে নয়। বিতর্কটা হলো রাষ্ট্র কি সত্যকে তার জায়গায় ফিরিয়ে আনবে, নাকি সুবিধাজনক নীরবতাকে নিরপেক্ষতা বলে চালিয়ে দেবে। গণঅভ্যুত্থান মানুষকে প্রশ্ন করার সাহস দিয়েছে। এখন রাষ্ট্রের পালা সে কি ইতিহাসের সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি ইতিহাসকে আবারও রাজনীতির হাতেই ছেড়ে দেবে।
লেখক: সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন