বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ক্রিস্টেনসেন কেন দিল্লিতে, রুবিও কেন যুক্ত হলেন—নেপথ্যে কোন সমীকরণ *** হাদির নাম মুছে আগের নামেই ফিরছে ঢাবির ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ *** নিখোঁজ ফটোসাংবাদিক বাদল দাস কারাগারে *** ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩, ভারতের ২: ওয়ানডেতে প্রথমবার ৫ সেঞ্চুরি *** হকার উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে: জামায়াত আমির *** ডিবি পরিচয়ে ফোন, পরে নিখোঁজ হন ফটোসাংবাদিক বাদল দাস *** সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, কারা হেফাজতে মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি: এমএসএফ *** প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে দেশের স্বার্থ ও বৈশ্বিক সম্ভাবনার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে: মাহদী আমিন *** দুর্গাপূজা পালনে সব নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ল লিটারে ১১ টাকা ৯২ পয়সা

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ক্রিস্টেনসেন কেন দিল্লিতে, রুবিও কেন যুক্ত হলেন—নেপথ্যে কোন সমীকরণ

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন, ১লা অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন হঠাৎ নয়াদিল্লিতে গেলেন। সময়টিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা ছাড়েন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্রিস্টেনসেনের এটি চার মাসের মধ্যে তৃতীয় দিল্লি সফর। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে একসঙ্গে বসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ১১টি দেশে দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানেরা। বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও ভার্চুয়ালি যুক্ত হন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বৈঠকের আয়োজক ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ-মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর।

এই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন উঠেছে—ক্রিস্টেনসেনের দিল্লি যাওয়া কি নিছক নিয়মিত কূটনৈতিক সমন্বয়? নাকি বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আঞ্চলিক হিসাবের সঙ্গে এর যোগ আছে?

প্রকাশ্য তথ্য এখন পর্যন্ত কোনো গোপন বৈঠক বা বাংলাদেশের বিষয়ে কোনো বিশেষ সিদ্ধান্তের প্রমাণ দেয় না। তবে ঘটনাগুলোর সময়, অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমে বৈঠকটির ধরন বোঝা দরকার। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশের রাষ্ট্রদূত জড়ো হননি। জড়ো হয়েছেন ওই দেশগুলোতে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানেরা। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক কাঠামোর একটি বড় অংশ এই বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে।

বৈঠকটি আয়োজন করেছেন সার্জিও গোর। এই পরিচয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নন। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত। ফলে নয়াদিল্লিতে তার নেতৃত্বে এমন একটি বৈঠক আয়োজনের মধ্যে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক সমন্বয়—দুই বিষয়ই রয়েছে।

বাংলাদেশের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘নবভারত টাইমস’ ও ‘নিউজ২৪’ জানিয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি যান। ‘নর্থইস্ট নিউজ’ও জানিয়েছে, চার মাসে এটি তার তৃতীয় দিল্লি সফর। তার আগের সফরগুলোর একটি হয়েছিল সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরের আগে। আরেকটি হয়েছিল মার্কো রুবিওর দিল্লি সফরের আগে। এখানেই বিষয়টি কেবল একটি রাষ্ট্রদূতের সফর হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।

কারণ ক্রিস্টেনসেন গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাণিজ্য ও মার্কিন কোম্পানির বাজারসুবিধা নিয়ে বিনিয়োগ বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সীমান্ত ও অভিবাসন পরিস্থিতি দেখতে রাজশাহী ও সোনামসজিদ স্থলবন্দরেও গেছেন। জুনে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি পরিদর্শনের সময় মার্কিন সহায়তায় পুলিশ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আবার চালুর সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।

অর্থাৎ ক্রিস্টেনসেনের ঢাকা মিশনে এখন শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই। নিরাপত্তা, সীমান্ত, অভিবাসন, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ—একাধিক বিষয় একসঙ্গে রয়েছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর। জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি প্রথমবার ঢাকায় আসেন। সে সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার আলোচনা হয়। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন। সফরের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গোর একই সফরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, গোরের সফর ছিল অনুসন্ধানী ধরনের। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আরও বিস্তৃতভাবে বুঝতে চাইছে। বিশেষ করে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে এগোচ্ছে, সেটি ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এমন ব্যাখ্যাও তখন সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ক্রিস্টেনসেন দিল্লিতে গেলেন। আর দুই দিনের মধ্যে নয়াদিল্লিতে বসে গেল দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মার্কিন কূটনীতিকদের সম্মেলন।

এখানে আরেকটি ঘটনা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকায় পৌঁছান। একই দিনে ক্রিস্টেনসেন দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। ভারতীয় ‘নিউজ২৪’ ও ‘নর্থইস্ট নিউজ’ এই সময়গত মিলকে গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে। তবে তারা যে প্রশ্ন তুলেছে, সেটি মূলত সফরের সময়কে ঘিরে। সফরটির উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো নিশ্চিত গোপন তথ্য তারা প্রকাশ করেনি।

তাই এটিকে সরাসরি তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত জানায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজের মোট পরিকল্পিত ক্রয় ২৫টিতে দাঁড়ায়। এর আগে এপ্রিল মাসে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে ক্রিস্টেনসেনের ভূমিকা সরাসরি যুক্ত। তিনি নিজেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মাত্র কয়েক দিন পর তার দিল্লি যাত্রা এবং আঞ্চলিক মার্কিন কূটনীতিকদের বৈঠক—ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা তাই নজর কাড়ে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে মার্কো রুবিওকে নিয়ে। রুবিও কেন নয়াদিল্লির এই বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হলেন? মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে রুবিও এখন একই সঙ্গে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক নানা সংকট সামলাচ্ছেন। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অর্থ হলো মাঠপর্যায়ের কূটনৈতিক মূল্যায়ন সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ে নেওয়া। রুবিও নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ভারত থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত।

বৈঠক থেকে নতুন কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা বাংলাদেশের বিষয়ে আলাদা নীতির ঘোষণা আসেনি। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো গোপন সিদ্ধান্তের দাবি করার ক্ষেত্রে এই অনুপস্থিতিটিই একটি সীমা তৈরি করে। প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে রুবিওর অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তবে বৈঠকের সময়টি আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবরের মাঝামাঝি রুবিওর উজবেকিস্তান সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ‘সি৫ প্লাস ১’ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা। একই সফরে শতাধিক মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিও থাকার কথা। আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সেখানে গুরুত্ব পাবে।

অর্থাৎ নয়াদিল্লির বৈঠকটি কেবল বাংলাদেশ বা ভারতকে ঘিরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াকে একটি সংযুক্ত কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ সেই অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্তে। ভারত এর কেন্দ্রীয় শক্তি। পাকিস্তান নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর মধ্য এশিয়া জ্বালানি, যোগাযোগ ও ভূরাজনীতির কারণে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক এখনও সংবেদনশীল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সরাসরি সম্পৃক্ত করছে। জুলাইয়ে গোর ঢাকায় এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। ক্রিস্টেনসেন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে কাজ করছেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সম্পর্কও সক্রিয়। জুলাইয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হওয়া অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার অর্থ নয়।

ডেইলি স্টার’-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্লেষণটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সম্পর্ককে পুরোপুরি নয়াদিল্লির দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখার পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছে। তবে ভারতকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করছে।

এখানে মূল সমীকরণটি সম্ভবত ‘বাংলাদেশ না ভারত’—এমন সরল সমীকরণ নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দুই দেশের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। আবার ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও ধরে রাখছে।

ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাও এই হিসাবকে জটিল করেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে রুবিও ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সম্পর্ক এবং নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ও জানিয়েছে, আলোচনায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয় উঠে এসেছে।

অর্থাৎ নয়াদিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকের পেছনে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের বড় সমীকরণও রয়েছে। আর সেই সমীকরণের মধ্যে বাংলাদেশ কোথায়—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ক্রিস্টেনসেনের দিল্লি সফরকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য কমে যায়। গত কয়েক মাসে তার দিল্লি সফর, গোরের ঢাকা সফর, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে মার্কিন তৎপরতা, তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং এরপর নয়াদিল্লিতে ১১ দেশের মার্কিন কূটনীতিকদের বৈঠক—সবগুলো ঘটনা একই সময়সীমায় ঘটেছে।

যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন শুধু ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের বাণিজ্য, বঙ্গোপসাগর, সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—সবগুলো বিষয়ই বৃহত্তর মার্কিন আঞ্চলিক হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছে।

তাই ক্রিস্টেনসেন কেন দিল্লিতে গেলেন—এর সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর হলো, তিনি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমন্বয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেখানে গেছেন। আর রুবিও কেন যুক্ত হলেন—তার প্রকাশ্য ব্যাখ্যাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। ওয়াশিংটন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মাঠপর্যায়ের কূটনীতিকদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করতে চাইছে।

কিন্তু নেপথ্যের আসল সমীকরণটি আরও বড়। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ভারতকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে বাংলাদেশকেও সরাসরি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনকে ঘিরে প্রতিযোগিতা, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছে।

সুতরাং নয়াদিল্লির বৈঠকের সবচেয়ে বড় বার্তা কোনো গোপন সিদ্ধান্তে নয়। বার্তাটি হলো—দক্ষিণ এশিয়াকে ওয়াশিংটন এখন একক দেশের চোখ দিয়ে নয়, একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেখছে। আর সেই কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশকে আগের চেয়ে সরাসরি হিসাবের মধ্যে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250