সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের সামনেই প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হেনস্তার চেষ্টা

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১০:৪৭ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পেরে ক্ষুব্ধ বিএনপির একদল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামকে হেনস্তার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোররাতে নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে এ ঘটনা ঘটে বলে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে।

ঘটনার সময় শামা ওবায়েদের ছেলে সেখানে ছিলেন বলে জানা গেছে। ভিডিওতে কয়েকজনকে উত্তেজিত অবস্থায় চিৎকার ও গালাগাল করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজনকে শামা ওবায়েদকে মারধরের কথা বলতে শোনা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তার ছেলে এগিয়ে গেলে তাকেও ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির দৃশ্য নিয়ে এরই মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা, ধারণের সময় এবং ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় সুখবর ডটকম স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ভিডিওতে দেখা যায়, শামা ওবায়েদ একটি লিফটের ভেতরে ছিলেন। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা লিফটের বাইরে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তার ছেলে সামনে এগিয়ে আসেন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন বলে ভিডিওতে শোনা যায়। এরপর তাকে ধাক্কা দেওয়ার মতো ঘটনা দেখা যায়।

ভিডিওর শেষাংশে এক নারীকে শামা ওবায়েদের ছেলের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই নারী তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছেন—এমন দৃশ্যও ভিডিওতে রয়েছে।

ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

দলীয় প্রধানকে কাছ থেকে দেখা এবং শুভেচ্ছা জানানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিউইয়র্কে জড়ো হন। তাদের অনেকে গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের আশপাশে অবস্থান নেন। দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। অনেক নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। এতে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

এই ক্ষোভেরই একপর্যায়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে শামা ওবায়েদকে ঘিরে ঠিক কী কারণে ওই ব্যক্তিরা উত্তেজিত হয়েছিলেন, তাদের পরিচয় কী এবং ঘটনাটির আগে সেখানে কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

অনেকের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও তার মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে প্রকাশ্যে হেনস্তার চেষ্টা করা হলে সেটি নিছক দলীয় অসন্তোষের ঘটনা থাকে না। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে তার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এবং ছেলের দিকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তার বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান বিএনপির সাবেক মহাসচিব এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সময় শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

সরকারের দায়িত্ব পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শামা ওবায়েদকে সক্রিয় দেখা গেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে তিনি একাধিক বৈঠকে অংশ নেন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব মেডিয়েশন’-এর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিনি সংঘাত তীব্র হওয়ার আগেই মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এর আগে নারীর প্রতি অনলাইন হয়রানি ও প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথাও বলেছেন তিনি। সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে এক বৈঠকে শামা ওবায়েদ নারীর বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশের উদ্যোগ তুলে ধরেন।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাইবার অপরাধ, নারীর প্রতি সহিংসতা, অশালীন ভাষা ও হয়রানি ঠেকাতে কার্যকর আইন করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।

এ কারণে নিউইয়র্কের ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বিদেশের মাটিতে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি, অশালীন ভাষা ব্যবহার কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা—যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণ হয়, তবে তা কেবল দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রবাসী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে ঘটনাটি ঘটেছে এমন একটি হোটেলে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অবস্থান করছিলেন। নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশি রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ যদি ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যান, তাহলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নিয়েও নানা মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। কেউ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলছেন, রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশেরও একটি সীমা থাকা উচিত। আবার কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না পাওয়ার ক্ষোভ থাকলে দলীয়ভাবে তা জানানো যেত। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়ার বেশির ভাগের উৎস ও পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, শামা ওবায়েদ বিদেশে অবস্থান করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ঘটনার বিষয়ে তার বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যও স্বাধীনভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে কারা ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের দলীয় পরিচয় কী এবং ঘটনাটির পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী—এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। রাজনৈতিক মতবিরোধ, ক্ষোভ কিংবা নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ না পাওয়ার হতাশা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আক্রমণ বা পরিবারের সদস্যদের হেনস্তার পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা জরুরি। ভিডিওটি সত্য হলে সেখানে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভিডিওটি সম্পাদিত বা খণ্ডিত কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার শেষপর্বে এমন একটি ঘটনা সেই সফরের রাজনৈতিক আবহকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি শারীরিক উত্তেজনা ও হেনস্তার অভিযোগে গড়ায়, তাহলে সেটি আর সাধারণ অসন্তোষের পর্যায়ে থাকে না।

শামা ওবায়েদ ইসলাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250