ছবি: সংগৃহীত
ভোলা সদর উপজেলায় দাফনের ১৮ দিন পর মরিয়ম (২০) নামের এক তরুণীর কবর খুঁড়েছেন তার স্বজনরা। স্বজনদের দাবি, স্বপ্নে ওই তরুণী নিজেকে কবরে জীবিত বলে জানিয়েছেন। গত ১৬ জুন বিকেলে উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চর রমেশ গ্রামে এ অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।
মৃত মরিয়ম চর রমেশ গ্রামের দিনমজুর খলিল লাহারির মেয়ে। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে মরিয়ম কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে যান এবং সেখানে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। গত ২৬ মে ঈদুল আজহার ছুটিতে তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। বাড়িতে আসার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৮ মে, ঈদের দিন ভোরে মরিয়ম মারা যান। ওই দিনই ঈদের নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
দাফনের ১৫ দিন পর এলাকায় একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মরিয়মের কবর থেকে অলৌকিক সুগন্ধি বের হচ্ছে। এর কিছুদিন পর মরিয়মের এক ভাই ও এক বোন রাতে স্বপ্নে দেখেন যে, মরিয়ম কবরের ভেতর জীবিত আছেন এবং তাকে জীবিত উদ্ধার করতে হবে। স্বপ্নের কথা জানাজানি হলে প্রতিদিন শত শত উৎসুক মানুষ কবরটি দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করেন।
বিষয়টি নিয়ে মরিয়মের পরিবার স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এটিকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেন। আলেমরা তাদের কবরের ওপর নতুন করে মাটি দিতে এবং বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেন। তবে সব পরামর্শ উপেক্ষা করে প্রায় দুই শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে মরিয়মের স্বজনরা কোদাল দিয়ে কবরটি খুঁড়ে ফেলেন।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম আবুল কাশেম বলেন, “আমি নিজেই মরিয়মের জানাজার নামাজ পড়িয়েছি। তার ভাই-বোনরা স্বপ্নে মরিয়মকে জীবিত দেখার কথা জানালে আমরা তাদের বুঝিয়েছিলাম যে, এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। ইসলামে দাফনের পর এভাবে কবর খোঁড়ার কোনো সুযোগ নেই।”
কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. কালু জানান, স্বজনদের মনের সন্দেহ ও আকুলতা দূর করার জন্যই মূলত কবরটি খোঁড়া হয়েছিল। তবে কবর খোঁড়ার পর সেখানে মৃতদেহের স্বাভাবিক অবস্থা দেখে স্বজনদের সেই বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দূর হয়।
এ বিষয়ে ভোলা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, “কবর খোঁড়ার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তবে কয়েক দিন আগে ওই তরুণীর পরিবার থানায় এসে কবর থেকে সুগন্ধি বের হওয়ার দাবি করেছিল। আমরা তখন তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, আইন অনুযায়ী কবর খুঁড়তে হলে আদালতের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।”
এদিকে কবর খোঁড়ার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নেটিজেনদের একাংশ ঘটনাটিকে কুসংস্কার ও গুজবের বিপজ্জনক পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী রাকিব হাসান লিখেছেন, “স্বপ্ন কখনো বাস্তবতার প্রমাণ হতে পারে না। শিক্ষার অভাব ও গুজবের কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে।” আরেক ব্যবহারকারী নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “পরিবারের আবেগকে সম্মান করি, কিন্তু মৃত ব্যক্তির কবর এভাবে খুঁড়ে ফেলা ঠিক হয়নি।”
তবে কেউ কেউ পরিবারের মানসিক অবস্থার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। মাহমুদুল ইসলাম নামে একজন লেখেন, “প্রিয়জনকে হারানোর শোক মানুষকে অনেক সময় অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। পরিবারটিকে দোষারোপ না করে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।”
অন্যদিকে তানভীর আহমেদ নামে এক নেটিজেন বলেন, “গুজব কীভাবে শত শত মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে, এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।” ভিডিওটির নিচে অধিকাংশ মন্তব্যেই ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন