ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
শংকর মৈত্র
ভারত বাংলাদেশে “করণিক কূটনীতির” অধ্যায় শেষ করে “রাজনৈতিক কূটনীতি” পলিসি নিয়ে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী দেশটির পেশাদার সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এবার একজন রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশ মিশনে পাঠানো হচ্ছে। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, পেশাদার কূটনীতিক সন্দীপ চক্রবর্তীকে হাইকমিশনার করা হবে, যিনি একসময় ঢাকা মিশনে উপ-রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পরে সেখান থেকে সরে আসে দিল্লির সাউথ ব্লক।
তারা পেশাদার করণিক কূটনীতির চেয়ে রাজনৈতিক কূটনীতির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে। শুরুতে আলোচনায় ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর, সাবেক মন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খান, শশী থারুর। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হয়েছে রাজনীতিক ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে পাঠানোর। দীনেশ ত্রিবেদী একজন রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী। তার জন্ম কলকাতায় ১৯৫০ সালে। কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় তিনি রেলমন্ত্রী ছিলেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তিনি মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। সেখান থেকে ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। ত্রিবেদী ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি থিঙ্কট্যাংকের সঙ্গে জড়িত। অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর তার প্রকাশনা রয়েছে। তার তত্ত্ব হলো, “জনপ্রিয়তার চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ।” তাকে মধ্যপন্থী ও অর্থনৈতিকভাবে বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক বিশেষ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ চলছে। ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে শীতল যুদ্ধের আবহ বিরাজ করছে। আসমুদ্রহিমাচলের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক চরম খারাপের দিকে নিয়ে যায়—এমনটি বলা হচ্ছে। জঙ্গিবাদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা ভারতে আশ্রয় নেন। ড. ইউনূস ও তার সঙ্গীদের পক্ষ থেকে ভারতের সেভেন সিস্টার দখলের হুমকি দেওয়া হয়েছে—এমন বক্তব্যও প্রচারিত হয়, যা দুই দেশের সম্পর্ককে তলানিতে ঠেলে দেয়। ভারত পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয় এবং বেনাপোল ছাড়া সব স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চরম ক্ষতির মুখে পড়ে। দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক তিক্ততার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ভারত জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। নতুন সরকার দুই মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছে। ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। পাইপলাইনে ডিজেল আসছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ভারত সফর করে এসেছেন। ড. ইউনূসের সময়ে তৈরি হওয়া বরফ ধীরে ধীরে গলছে।
দুই প্রতিবেশীর বিরোধ কারও জন্যই ভালো নয়। আবেগে, হুজুগে বা জিঘাংসায় বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করলে উভয়েরই ক্ষতি হয়। বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই স্বাধীনতা কারও দয়ায় আসেনি; মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। আমরা মাথা উঁচু করে চলব। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলব, আর সব সম্পর্ক হবে মর্যাদার ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মর্যাদার ভিত্তিতে। স্বাধীনতাবিরোধীরা এই সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। তারা একাত্তরের গণহত্যাকারীদের পক্ষ নেবে।
ভারত এতদিন তাদের বাংলাদেশ মিশনে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদেরই মিশনপ্রধান হিসেবে পাঠিয়েছে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা রাজনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ দিচ্ছেন। বলছেন, হঠাৎ কেন ভারত তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে নীতি পরিবর্তন করল? বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তারা কি পেশাদার কূটনীতিকদের ব্যর্থতা দেখছে? যাদের করণিক কূটনীতি বলা হয়।
কী এমন হলো যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতাকে বাংলাদেশে পাঠাতে হচ্ছে? যিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী—বাংলাদেশে তার অবস্থান ও প্রটোকল কী হবে? এতদিন যারা হাইকমিশনার ছিলেন তারা সচিব পদমর্যাদার ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য কি সেই একই মর্যাদায় থাকবেন? এমন নানা প্রশ্ন আলোচনা হচ্ছে কূটনীতির অন্দরমহলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে রাজনীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখান থেকে উত্তরণে কূটনীতির চেয়ে রাজনৈতিক বন্ধুত্ব ও তৎপরতা বেশি প্রয়োজন। রাজনৈতিক সম্পর্কই সবচেয়ে মজবুত হয়। ভারত কি তাদের বাংলাদেশ মিশনে একজন রাজনৈতিক নেতাকে পাঠিয়ে সে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে চাচ্ছে? দেখা যাক কী হয়!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন