ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোববার (১৭ মে) রাতে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নগরীর টাইগার পাস-লালখান বাজার এলাকার পরিস্থিতি। পরে মধ্যরাতে লালখান বাজার এলাকায় যান সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, নগরীর টাইগার পাসে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে পোস্টার লাগানোর কারণে পুরনো গ্রাফিতি ঢাকা পড়ে যায়। নতুনভাবে পিলারে রঙ করার কাজ শেষে আবার গ্রাফিতি আঁকা হবে। তবে এবার গ্রাফিতি আঁকবে ছাত্রদল ও যুবদল।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে থাকা জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি সিটি করপোরেশনের নির্দেশে মুছে ফেলা হয়েছে, এমন অভিযোগে রোববার সন্ধ্যার পর প্রতিবাদে নামেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। বিপরীতে এনসিপির বিক্ষোভ থেকে মেয়র শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে একই এলাকায় রাতে মিছিল করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
একপর্যায়ে রাত ১১টার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা টাইগার পাস এলাকায় এবং ছাত্রদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা লালখান বাজার মোড়ে অবস্থান নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন একটি বিতর্ক সামনে এসেছে—গ্রাফিতি শুধু দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি ও স্লোগান, নাকি এটি একটি আন্দোলনের স্মৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সময় দেয়ালচিত্র, প্রতীকী আঁকাআঁকি ও গ্রাফিতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আন্দোলনের বার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নেতাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী নগর ভবনের প্রবেশপথ সংলগ্ন অংশে চারটি পিলারের গ্রাফিতির ওপর নতুন করে সাদা ও হলুদ রং করা হয়েছে।
এরকম কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষুদ্ধ এনসিপি নেতারা দাবি করেন, সিটি মেয়রের শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলেছে।
এ নিয়ে দুপুরে এনসিপির একাংশের কিছু নেতাকর্মী মেয়রের সঙ্গে দেখা করে তাদের আপত্তির কথা জানান। তখন মেয়র তাদের বলেন, ওই পিলারগুলোতে নতুন করে গ্রাফিতি করা হবে। পরে বিকেলে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব, সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়।
এসময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন মেয়রের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভকারীরা সড়কে স্লোগান লেখেন এবং গ্রাফিতি মুছে দেওয়া পিলারগুলোতেও নতুন করে স্লোগান লেখেন। বিক্ষোভ চলাকালে মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, "আমরা জানি বর্তমান মেয়র মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র। উনার মেয়াদ চলে গেছে। কিন্তু আমরা জানতাম না, উনার ব্রেইনেরও মেয়াদ চলে গেছে।"
তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসছে—শহরের দেয়াল ও অবকাঠামোর যত্রতত্র গ্রাফিতি সংরক্ষণ করা কতটা যৌক্তিক। কারণ একটি শহর কেবল রাজনৈতিক স্মৃতি বহন করে না, এটি নাগরিকদের বসবাস, চলাচল এবং নান্দনিক পরিবেশেরও অংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট দেয়াল, স্মারক এলাকা বা সাংস্কৃতিক স্থানের ব্যবস্থা থাকে। ফলে একদিকে ইতিহাস রক্ষা করা যায়, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্যও বজায় থাকে।
এনসিপির নেতারা জানান, টাইগার পাস এলাকায় সিটি করপোরেশনের প্রবেশফটকের সামনে অন্তত চারটি পিলারের গ্রাফিতির ওপর সাদা ও হলুদ রং করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এনসিপির নেতারা দাবি করেন, সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে রাত ৮টায় শাহাদাতের পক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, "মেয়রের নির্দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত কোনো গ্রাফিতি মোছা হয়নি।” মেয়রের এ বিবৃতির পরেও এনসিপির নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ চলে। একপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের আমবাগানমুখী প্রবেশপথের সামনে সড়কে রং দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান লিখে দেন তারা। তাদের অবস্থান চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। রাত ১১টার দিকে মেয়র ও বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে মাঠে নামেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
একপর্যায়ে পুলিশ এসে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। তখন এনসিপির নেতাকর্মীরা টাইগার পাসে এবং ছাত্রদল নেতাকর্মীরা লালখান বাজার মোড়ে অবস্থান নেন। পরে রাত ১২টার দিকে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন লালখান বাজার মোড়ে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
এসময় মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, "চব্বিশের আন্দোলনে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমার কর্মী। জুলাই-অগাস্টের সেন্টিমেন্ট আমার চেয়ে বেশি কেউ ধারণ করে না। মায়াকান্না যারা দেখাতে আসেন, আমার সঙ্গে দেখাবেন না।"
তিনি বলেন, "এরপরও এনসিপির এক বিতর্কিত নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কর্মসূচি দিয়েছে। ফায়দা লুটতে চায়।”
শহর পরিকল্পনাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, নগর সৌন্দর্য রক্ষার জন্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে নতুন রঙ, নকশা কিংবা শিল্পকর্ম যুক্ত করার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ফ্লাইওভার, পিলার, সড়ক বিভাজক কিংবা নগর ভবনের দেয়ালে নিয়মিত সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে পুরোনো গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র সবসময় অপরিবর্তিত অবস্থায় রেখে দেওয়া বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে অথবা স্মৃতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ ধরনের বিতর্ক কমতে পারে বলে অনেকের মত।
ঘটনাটি এখন শুধু কয়েকটি পিলারের রঙ বা দেয়ালচিত্র নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রাজনৈতিক স্মৃতি, আন্দোলনের প্রতীক, দলীয় অবস্থান এবং নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। সামনে নতুনভাবে গ্রাফিতি আঁকার উদ্যোগ পরিস্থিতি কতটা শান্ত করতে পারে, সেটিও এখন দেখার বিষয়।
খবরটি শেয়ার করুন