মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘শেখ হাসিনা কেন এখনো এনডিটিভির চোখে প্রধানমন্ত্রী’ *** গাজী নজরুলের এমপি পদ থাকবে কি না, সিদ্ধান্ত পুলিশের ব্যবস্থা দেখে *** এত কিছুর পরেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকে কীভাবে: টিআইবি *** ঋণ পরিশোধ না করায় মেসির নতুন ক্লাবের শেয়ার জব্দ *** লঞ্চভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব *** বর্তমান সরকারের জন্য এয়ারবাস হলো ‘পরীক্ষা’: ফরাসি রাষ্ট্রদূত *** আসাদ আলম সিয়ামকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার করার সিদ্ধান্তে সম্মতি ভারতের *** কুড়িগ্রামে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ, পরে বিতরণ শুরু *** রিমান্ডে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, আদালতকে জানালেন তদন্ত কর্মকর্তা *** সৌদির অনুরোধে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প, সরে দাঁড়ান শেষ মুহূর্তে

‘শেখ হাসিনা কেন এখনো এনডিটিভির চোখে প্রধানমন্ত্রী’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:০৮ অপরাহ্ন, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার প্রত্যয় জানিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ, গ্রেপ্তার কিংবা কারাবাস—কোনোটিকেই নিজের প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হিসেবে দেখছেন না তিনি। বরং দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের কথাও বলেছেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাক্ষাৎকারের শুরুতে এবং শেষেও এনডিটিভির উপস্থাপক তাকে বাংলাদেশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন করেন। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি আর দেশের সরকারপ্রধানের পদে নেই। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এনডিটিভির সরাসরি সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে উপস্থাপকের এই সম্বোধন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনা কেন এখনো এনডিটিভির চোখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী? তবে একই সাক্ষাৎকারের লিখিত সংস্করণে এনডিটিভি তাকে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেই উল্লেখ করেছে। এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘প্রশ্ন কখন নয়, বরং কীভাবে: দেশে ফেরা নিয়ে এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা’। সেখানে তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সরাসরি সম্প্রচারের সময় উপস্থাপকের সম্বোধন এবং ওয়েবসাইটের লিখিত প্রতিবেদনের পরিচয়ে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এই পার্থক্য নিয়েই মূলত আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার সরাসরি সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করেন এনডিটিভির উপস্থাপক। সাক্ষাৎকারের শুরুতে যেমন তাকে ওই পরিচয়ে ডাকা হয়, শেষেও একইভাবে উল্লেখ করা হয়। এর বাইরে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা, মৃত্যুদণ্ডের রায়, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার ভাষায়, তিনি নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার রাখেন। দেশে ফেরার পর কারাবাসসহ যেকোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতেও তিনি প্রস্তুত।

তবে কীভাবে দেশে ফিরবেন, সেই পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। তার বক্তব্যে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন হিসেবে নয়, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবেও উঠে আসে।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে তার প্রত্যাবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনের কাঠামোর মধ্যে হওয়াই তার প্রত্যাশা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মূল প্রশ্ন তিনি ফিরবেন কি না, তা নয়; বরং কীভাবে ফিরলে দেশের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশের একটি ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। ওই বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়কে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অন্যায্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তার দাবি, তার দেশ ছাড়ার পর গঠিত সরকার অসাংবিধানিক এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে।

তবে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি। তার বক্তব্য, কারাবাসসহ যেকোনো আইনি পরিণতি মেনে নেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি তার বিরুদ্ধে যেকোনো বিচারিক কার্যক্রমে পূর্ণ আইনি সুরক্ষার দাবি করেন।

দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের সরকারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না, এ বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কিছু জানাননি শেখ হাসিনা। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ঘোষণা থাকলেও সেই প্রত্যাবর্তনের বাস্তব পথ এখনো স্পষ্ট নয়।

সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন তিনি। দেশে আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বক্তব্যটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি জানান, দলের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন এলাকার সমর্থকদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ স্থাপনের কাজ চলছে।

আওয়ামী লীগকে দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অভিভাবক হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। দলের পুনরুজ্জীবনে নিজের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য হলো দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার সংরক্ষণের কথাও বলেন তিনি।

সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দেশে উগ্রবাদ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্য। শেখ হাসিনা দাবি করেন, দেশে সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হুমকি গুরুতর। তিনি এ হুমকিকে অবমূল্যায়ন না করার আহ্বান জানান।

উগ্রবাদ মোকাবিলায় শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতার ভারসাম্য রাখার কথাও বলেন।

শেখ হাসিনার বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও উঠে আসে। তার মতে, উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক ও মতাদর্শ কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন।

তবে এনডিটিভির সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধনের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। কারণ এটি শুধু একটি পরিচয় ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাকে নিয়মিত ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এনডিটিভির লিখিত প্রতিবেদনও তার ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক অন্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে।

তাই মঙ্গলবারের সরাসরি সাক্ষাৎকারে উপস্থাপকের মুখে ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন অনেক দর্শকের কাছে আলাদা করে চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ এটিকে উপস্থাপকের অনিচ্ছাকৃত ভুল বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ভারতের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের একটি অংশ এখনো শেখ হাসিনাকে তার সাবেক পদবির পরিবর্তে ‘প্রধানমন্ত্রী’ পরিচয়ে দেখে বা উপস্থাপন করে।

তবে এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লিখিত প্রতিবেদন এই ধারণাকে সরাসরি সমর্থন করে না। সেখানে তাকে স্পষ্টভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সাক্ষাৎকারের সম্প্রচারিত সংস্করণে উপস্থাপকের সম্বোধন এবং ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষা এক নয়।

এই পার্থক্যই প্রশ্নটিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। উপস্থাপকের মুখের সম্বোধন কি কেবল তাৎক্ষণিক ভুল, নাকি শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি অংশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভাষাগত অভ্যাসের প্রতিফলন—সেটি নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে। তবে এনডিটিভি নিজে এ সম্বোধনের কারণ ব্যাখ্যা করে কোনো বক্তব্য দিয়েছে কি না, তা এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্যে তার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। তিনি ক্ষমতা হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেননি। বরং দেশে ফেরার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন।

ফলে ২২ সেপ্টেম্বরের এনডিটিভি সাক্ষাৎকারটি শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে নয়, তাকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। সাক্ষাৎকারের বক্তব্যে শেখ হাসিনা নিজেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। আর এনডিটিভির সরাসরি সম্প্রচারে উপস্থাপকের ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন সেই বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করেছে।

তবে এনডিটিভির লিখিত প্রতিবেদনে তাকে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করায় একটি বিষয় পরিষ্কার—সরাসরি সম্প্রচারের সম্বোধন এবং সংবাদমাধ্যমটির আনুষ্ঠানিক লিখিত পরিচয় একই নয়। এখন প্রশ্ন হলো, উপস্থাপকের ওই সম্বোধন কি নিছক একটি তাৎক্ষণিক ভুল ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সম্পাদকীয় বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এ বিষয়ে এনডিটিভির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি মূলত দর্শক ও পাঠকদের আলোচনার মধ্যেই থাকবে।

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250