ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের জার্সি পরা অবস্থায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দেখা যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বিষয়টিকে সাধারণ একটি ব্যক্তিগত পছন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে একটি ‘বার্তা দেওয়ার চেষ্টা’ বলে মনে করছেন।
গতকাল সোমবার থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রায় এক মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে ট্রাইব্যুনালের দিকে হাঁটছেন জুনাইদ আহমেদ পলক। তার গায়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি। এ সময় তার চারপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন বন্দি আসামি কীভাবে এমন পোশাক পরে আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হলেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, কারাগারের বিধি-বিধানের মধ্যেই হয়তো এই পোশাক ব্যবহারের সুযোগ ছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জুনাইদ আহমেদ পলক রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত একটি নাম। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি আলোচনায় ছিলেন। ২০০৮ সালে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা শুরু করার পর তিনি নাটোর-৩ (সিংড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়েই দেশে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ উদ্যোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কও তৈরি হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আত্মগোপনে যান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৪ সালে রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত মামলায় তদন্ত শুরু হয়। বর্তমানে এসব মামলায় তিনি কারাগারে রয়েছেন। মামলাগুলোর শুনানির অংশ হিসেবেই সম্প্রতি তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া ছিল বৈচিত্র্যময়। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদ রাকিব নামের একজন লিখেছেন, “রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামিকে আদালতে আনা হয়েছে। সেখানে তার পোশাকের চেয়ে মামলার অগ্রগতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
অন্যদিকে সাদিয়া নওরীন নামের এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “ভিডিওটি দেখে মনে হয়েছে পলক যেন স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছেন। তবে একজন আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিটি পদক্ষেপই জনমনে কৌতূহল তৈরি করে।”
নাজমুল হক নামের আরেকজন লেখেন, “আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আদালতে আসা নিছক কাকতালীয় ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো বার্তা আছে—সেটি নিয়ে মানুষ আলোচনা করবেই।”
রিমি রহমান নামের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থন অনেক আবেগের বিষয়। হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। এটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।”
তবে সবাই একইভাবে বিষয়টি দেখেননি। আরাফাত করিম নামের একজন মন্তব্য করেন, “যে মামলাগুলোর শুনানি চলছে, সেগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জার্সি নিয়ে আলোচনা হওয়ায় মূল বিষয়টি আড়ালে চলে যাচ্ছে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর দেশজুড়ে দলটির সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও স্থান পায়। সেই প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা কোনো পরিচিত ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও দ্রুত মানুষের নজর কাড়ে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের যুগে রাজনীতিবিদদের প্রতিটি দৃশ্য, অঙ্গভঙ্গি কিংবা পোশাকও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যারা আলোচিত বা বিতর্কিত, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি দেখা যায়। ফলে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার মতো একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও পলকের পরা জার্সি আলাদা করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এদিকে মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ এখনও প্রক্রিয়াধীন। ফলে জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আইনের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।
ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও আদালত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বিচারিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা অবস্থায় ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে পলকের উপস্থিতি যে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত রাজনৈতিক দৃশ্যগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই।
খবরটি শেয়ার করুন