ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকার প্রধান কার্যালয়ের সামনে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একটি সংবাদপত্রকে ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সংবাদমাধ্যমের একটি শিরোনাম, গেরুয়া রংকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার সাম্প্রতিক সংঘাত। শেষ পর্যন্ত সেই বিরোধ গড়িয়েছে পত্রিকার কার্যালয়ের প্রবেশপথে গেরুয়া রং লাগানো পর্যন্ত।
মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতার প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়ের সামনে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল জড়ো হয়। তাদের অনেকের পরনে ছিল গেরুয়া পোশাক। মাথায় ছিল গেরুয়া পাগড়ি। তারা ‘জয় শ্রীরাম’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে পত্রিকার কার্যালয়ের প্রবেশপথের দুটি সাদা স্তম্ভে গেরুয়া রং লাগিয়ে দেন। প্রধান ফটকে গেরুয়া কাপড়ও ঝোলানো হয়।
ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা প্রায় আধা ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তারা চলে যান। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃপক্ষ স্তম্ভ দুটির গেরুয়া রং মুছে আবার সাদা করে দেয়।
আল্ট নিউজ-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। তাদের হাতে কোনো সংগঠনের ব্যানার ছিল না। পত্রিকার এক জ্যেষ্ঠ সম্পাদককে উদ্ধৃত করে আল্ট নিউজ জানিয়েছে, ঘটনার আশঙ্কায় শনিবার থেকেই কার্যালয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ ছিল। ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকতে এবং কেউ কেউ মুঠোফোনে দৃশ্য ধারণ করতে দেখা গেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও বিক্ষোভকারীদের স্তম্ভে রং লাগানো ঠেকায়নি।
কেন এই ক্ষোভ? এর উত্তর খুঁজতে যেতে হবে ২০ আগস্টের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায়। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ঘটনার পর ২১ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়—‘গেরুয়া গুন্ডামি’। প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গেরুয়া পোশাকধারীদের হামলা ও ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আল্ট নিউজ এবং দ্য সিয়াসাত ডেইলি—দুই মাধ্যমই এই শিরোনামকে বর্তমান বিরোধের প্রধান সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই শব্দচয়নেই আপত্তি বিজেপি নেতৃত্বের। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আনন্দবাজার পত্রিকাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেন। ২৫ আগস্ট তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। তার বক্তব্য ছিল, সংবাদপত্র সরকার বা মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু ‘গেরুয়া’ রংকে আক্রমণ করা যাবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। ২৮ আগস্ট এক সভায় তিনি আরও বলেন, গেরুয়া পোশাক পরা হাজার হাজার সাধু প্রস্তুত আছেন, শুধু তার সম্মতির অপেক্ষা।
এরপর ২৮ আগস্ট কলকাতার বউবাজার থানায় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ইশানী দত্ত রায়, প্রধান প্রতিবেদক সোমা মুখোপাধ্যায়সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগকারী সঞ্জয় শাস্ত্রী মহারাজের দাবি, গেরুয়া হিন্দুদের ধর্মীয় প্রতীক। সেটিকে ‘গুন্ডামি’র সঙ্গে যুক্ত করে শিরোনাম দেওয়া হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং জনশান্তি বিঘ্নিত করতে পারে।
এই অভিযোগের বিরোধিতা করেছে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো। ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কর্পস এবং প্রেস অ্যাসোসিয়েশন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন মামলা মুক্ত সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার প্রতি অবমাননা। তাদের মতে, কোনো শিরোনাম কারও কাছে অস্বস্তিকর বা আপত্তিকর হলেই সাংবাদিককে অপরাধী বানানো উচিত নয়।
আনন্দবাজার পত্রিকা অবশ্য ক্ষমা চায়নি। শিরোনামও প্রত্যাহার করেনি। বরং ঘটনার পর পত্রিকার সম্পাদক ইশানী দত্ত রায় সাদা করে দেওয়া দেয়ালের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙ্ক্তি—‘উচ্চ যেথা শির’—লেখেন।
মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের কোনো সংগঠনের পরিচয় প্রকাশ করেননি। তারা আনন্দবাজার পত্রিকাকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলেও আক্রমণ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক শব্দই বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে ফিরে আসে। তারা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও স্বামী বিবেকানন্দের মাটি। এটি গেরুয়ার মাটি। এখানে আনন্দবাজার পত্রিকার মতো ‘দিমাগি নকশালদের’ জায়গা নেই।
তবে আনন্দবাজার পত্রিকাকে ঘিরে হামলা বা চাপের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়। পত্রিকাটির নিজস্ব শতবর্ষের স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালে শাসকের পেশিশক্তির কারণে ৫২ দিন পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ছিল। তার আগে দলীয় পতাকা নিয়ে পত্রিকার কার্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডবের ঘটনাও ঘটেছিল।
গৌরকিশোর ঘোষের জীবনীভিত্তিক তথ্যেও এর পুরোনো নজির পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালে তার লেখা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বামপন্থী সমর্থকেরা আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে হামলা চালায়। জানালার কাচ ভাঙা হয়। তাকে হুমকিও দেওয়া হয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেও আনন্দবাজার পত্রিকা রাজনৈতিক আক্রমণের বাইরে ছিল না। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তখন লিখেছিল, এটি তার প্রথমবারের আক্রমণ ছিল না। ২০২০ সালেও আমফান ও করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সমালোচনা করেন এবং পত্রিকার বিরুদ্ধে পুলিশের মামলাও হয়।
কিন্তু এবার বিরোধের চরিত্র আলাদা। কারণ রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবাদপত্রটির সঙ্গে সরকারের প্রকাশ্য সংঘাত দ্রুত বেড়েছে। ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শিরোনাম সেই সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে।
ভারতের অন্য সংবাদমাধ্যম নিয়েও হিন্দুত্ববাদী ক্ষোভের নজির রয়েছে। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গুলির ঘটনা নিয়ে রিপাবলিক টিভির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে মুম্বাই কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, কার্যালয়ের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল এবং বিক্ষোভকারীদের জড়ো হওয়ার চেষ্টা ঠেকানো হয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে দিল্লির একটি হিন্দুত্ববাদী অনুষ্ঠানে ‘আর্টিকেল ১৪’-এর পাঁচ সাংবাদিককে হামলার মুখে পড়তে হয় বলে ‘ফ্রিডম হাউস’ জানিয়েছে। সাংবাদিকদের বেশির ভাগ মুসলিম—এ কথা জানতে পেরে বিক্ষোভকারীরা তাদের ওপর চড়াও হন। পুলিশ তাদের সরিয়ে নেয়। পরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের একটি বিক্ষোভে সাংবাদিকদেরও নিশানা করা হয়। ম্যাঙ্গালোর টুডে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের ভিডিও সাংবাদিককে ধাক্কা দেন। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সাংবাদিকেরা সম্মিলিতভাবে ঘটনাস্থল ছেড়ে যান।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ভারতে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। আল জাজিরা ২০২৩ সালের অক্টোবরে নিউজক্লিকের কার্যালয় ও সাংবাদিকদের বাড়িতে পুলিশের অভিযানকে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ও ভারতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাদের ২০২৫ সালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাংবাদিকদের ‘দেশবিরোধী’, ‘হিন্দুবিরোধী’ বা ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে অনলাইন আক্রমণের ঢেউ তৈরি করা হয়েছে।
ফলে কলকাতার মঙ্গলবারের ঘটনা শুধু আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে বিজেপি বা হিন্দুত্ববাদীদের বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে সংবাদমাধ্যম কী লিখবে, কোন শব্দ ব্যবহার করবে এবং সেই শব্দ নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে—সেই বড় প্রশ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পুলিশকে ঘিরে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের উপস্থিতিতেই পত্রিকার স্তম্ভে রং লাগিয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি থামায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবর বা শিরোনাম অপছন্দ হলে বিক্ষোভকারীরা কি একইভাবে কার্যালয়ের সামনে গিয়ে চাপ তৈরি করার সুযোগ পাবে?
আনন্দবাজার পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনি নিষ্পত্তি হতে পারে আদালতে। রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাবও দেওয়া যেতে পারে রাজনীতির মাঠে। কিন্তু একটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে গিয়ে রং লাগিয়ে দেওয়া সেই সীমা অতিক্রম করে কি না, এখন পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের সামনে সেটিই বড় প্রশ্ন। মঙ্গলবারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি পত্রিকার প্রবেশপথের রং বদলের ঘটনা নয়। এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার সীমারেখা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
খবরটি শেয়ার করুন