রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে তসলিমা নাসরিন ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা শুধু একজন নির্বাসিত লেখকের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিরও একটি প্রতীকী মুহূর্ত। প্রায় ১৯ বছর পর রবীন্দ্র সদনে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশ্য আশ্বাস নতুন করে আলোচনায় এনেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে।
ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম এই ঘটনাকে কেবল একটি সাহিত্যিক সংবর্ধনা হিসেবে দেখেনি। বরং তারা এটিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। বিশেষ করে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা, টিভি৯ বাংলাসহ একাধিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনায় তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তসলিমা নাসরিন যখন খুশি কলকাতায় আসতে পারবেন এবং যতবার ইচ্ছা আসতে পারবেন। তার নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করবে বলেও আশ্বাস দেন। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, শুভেন্দু অধিকারী লেখকের অবাধ যাতায়াত ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
এই আশ্বাসের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, তসলিমা নাসরিন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে, কলকাতা তার দ্বিতীয় ঘর। বাংলাদেশ ছাড়ার পর তিনি কলকাতাতেই স্থায়ীভাবে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে হয়। পরে তিনি দিল্লিতে দীর্ঘ সময় নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় ছিলেন। এরপর বিদেশে চলে যান।
তসলিমা পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চিঠি লিখেছিলেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাকেও লিখেছিলেন। কিন্তু তার দাবি অনুযায়ী, কোনো উত্তর তিনি পাননি। কলকাতায় ফিরে থাকার অনুমতিও মেলেনি। এ কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনেকের কাছে শুধু প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং পূর্ববর্তী দুই সরকারের অবস্থানের সঙ্গে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক পার্থক্য।
ভারতের বাংলা গণমাধ্যমগুলোও এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আনন্দবাজার পত্রিকা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শুভেন্দু সরকারের অবস্থান নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনও আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গত ১৯ বছর ধরে তিনি কলকাতাকে প্রশ্ন করেছেন—তার অপরাধ কী ছিল। কেন তাকে শহর ছেড়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এবার তিনি উত্তর খুঁজতে আসেননি। তিনি ফিরে এসেছেন ভালোবাসা নিয়ে।
তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল, “অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী হতে পারে না।” এই মন্তব্য উপস্থিত দর্শকদের করতালি পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বক্তব্যটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াও তাঁর বক্তব্যের এই অংশ তুলে ধরেছে। তবে পুরো অনুষ্ঠান বিতর্কমুক্ত ছিল না।
তসলিমা নাসরিন যখন কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন দর্শকদের একাংশ আপত্তি জানায়। কিছুক্ষণের জন্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জয় গোস্বামী বক্তব্য না দিয়েই নেমে যান।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রাজনৈতিক বিভাজন কতটা গভীর হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়েও এখন প্রকাশ্য বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল, তথাগত রায়সহ বিজেপির একাধিক নেতা। অগ্নিমিত্রা পল কবিতা আবৃত্তি করেন। স্বপন দাশগুপ্ত স্মৃতিচারণ করে বলেন, দিল্লিতে তসলিমার প্রতিবেশী থাকাকালে মতাদর্শগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই মনে করতেন, তার ভারতে থাকার সুযোগ পাওয়া উচিত।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই তসলিমা নাসরিনের বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করে, এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধু একজন লেখকের নিরাপত্তা নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং ভোটরাজনীতির আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে তসলিমার বক্তব্যের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করা মানেই কোনো ধর্মাবলম্বীর বিরুদ্ধে অবস্থান নয়—তসলিমা তার বক্তব্যে সেই কথাও বলেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ঘটনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। সম্প্রতি রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারীর সরকার বিভিন্ন প্রতীকী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তসলিমা নাসরিনকে প্রকাশ্যে সংবর্ধনা দেওয়া এবং নিরাপত্তার আশ্বাসও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
এতে বিজেপি এমন একটি বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা নিজেদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী। অন্যদিকে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, এই অবস্থান কতটা নীতিগত আর কতটা রাজনৈতিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক অনলাইন আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, ২০০৭ সালে তসলিমাকে শহর ছাড়তে হওয়া পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়। আবার অন্যরা মনে করছেন, বর্তমান সরকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে।
তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। দীর্ঘ ১৯ বছর পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফিরে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে। কলকাতাকে তিনি বহুবার নিজের প্রিয় শহর বলেছেন। তাই এই শহরে ফিরে প্রকাশ্যে সংবর্ধনা পাওয়া তার ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সব মিলিয়ে রবীন্দ্র সদনের এই অনুষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নতুন একটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যে নিশ্চয়তা তসলিমা নাসরিন পাননি বলে দাবি করেন, শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে সেই আশ্বাস দিয়েছেন। এই আশ্বাস ভবিষ্যতে বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে এর গুরুত্ব যে অনেক, তা ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন এবং জনমতের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট।
খবরটি শেয়ার করুন