রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী ভারত *** ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে’ *** মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত *** নতুন প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রামে অনুসারী কত হলো *** ‘শুরু থেকেই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আমার পথচলায় ছাই দিয়ে এসেছেন...’ *** কেন্দ্র দখলের অভিযোগ, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলার ঘোষণা ববি হাজ্জাজের *** ১৪ লাখ বাংলাদেশির ভিসা ইস্যু করেছে সৌদি: রাষ্ট্রদূত *** দ্রুত শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের *** ১৪ই এপ্রিলের মধ্যে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে ভোট: ইসি *** চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেউ নষ্টের চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না: চীনা রাষ্ট্রদূত

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের বিশ্লেষণ

‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:৪৩ অপরাহ্ন, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছরের মাথায় বাংলাদেশে একটি উৎসবমুখর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি। ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মসনদে বসেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার।

নির্বাচনে জনগণ এমন একজন নেতাকে বেছে নিয়েছে, যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আমূল পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার পর তারেক রহমান তার দলকে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছেন।

২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের পর—যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪ শতাধিক মানুষ নিহত হন—জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একটি শক্তিশালী বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই অস্থিরতা চূড়ান্ত রূপ পায়।

বাংলাদেশের দীর্ঘতম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতে বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই রায় একটি নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষের অনুরোধ সত্ত্বেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার—যাকে দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার প্রধান বহিঃশক্তির সমর্থনকারী হিসেবে দেখা হতো—তাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করেছে। বিষয়টি দুই দেশের মধ্যকার আগে থেকেই নড়বড়ে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে জনঅভ্যুত্থানের বৈধতা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনেরও স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিধি বিস্তৃত করেন। বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল নিয়মিত। 

আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল, যা তার ১৫ বছরের শাসনামলে নয়াদিল্লিতে সাতবার দ্বিপাক্ষিক সফরকে প্রতিফলিত হয়। সমালোচকদের মতে, এই কূটনৈতিক ছন্দ এমন এক পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, অথচ বাংলাদেশের মূল দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো রয়ে যায় অমীমাংসিত।

নিরাপত্তা সহযোগিতা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে সক্রিয় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয় এবং নজিরবিহীন মাত্রায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চালু করে। এতে নয়াদিল্লির সমর্থন মিললেও দেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গণআলোচনা হয়নি। সংযোগ ব্যবস্থায়ও ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়।

বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হয়নি। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতীয় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত অনুমোদিত হলেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে ঢাকা কখনো প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করেনি। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পরিমিত রাষ্ট্রনীতি, কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা। ক্ষমতাচ্যুতির পর শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।

বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন: ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়- বাংলাদেশ সবার আগে।’ 

তবে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ১৪ বছর পর করাচিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। ১৩ বছর পর পাকিস্তানি মন্ত্রীরা সফরে আসেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরায় শুরু হয় এবং বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বাড়ে।

বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক (দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস) সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, শেখ হাসিনার আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। দোলক ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেছিল, এখন বিপরীত দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি আছে। 

তারেক রহমান ইতোমধ্যে দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় রাজধানী থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব এখনো প্রবল।

বহু মানুষের চোখে ভারত বহিরাগত প্রভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে জনমতের চিত্র একপাক্ষিক নয়- অনেকে বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তারেক রহমানের বড় চ্যালেঞ্জ হবে- স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনি রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন ভাবনার দরজা খুলেছে। অঞ্চলটি আর কোনো এক শক্তির ‘পেছনের উঠান’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বাংলাদেশ সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণও এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। 

মূল বিষয় নাটকীয় পরিবর্তন নয়, বরং বার্তাটি- বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দায়িত্ব হবে বিকল্প সম্প্রসারণ, একক নির্ভরতা এড়ানো এবং ঢাকার কণ্ঠস্বরকে আরও দৃঢ় করা।

নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে, পুরোনো সম্পর্কগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে এবং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে পারে যে দেশটিকে আর অবহেলা করা যাবে না।

তারেক রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250