ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার বাইরে বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্টগার্ডের পরিচয়ে এক জেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এটি জোরপূর্বক গুমের প্রথম পরিচিত ঘটনা বলে মনে হচ্ছে।
একই সঙ্গে তারা অবিলম্বে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করা, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং গুম প্রতিরোধে নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মণি গ্রামের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখ পেশায় একজন জেলে। গত ১০ এপ্রিল রাতে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী তাকে কোস্টগার্ড সদস্যদের আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, পরদিন মিরাজের পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের জানানো হয়, তাকে নিয়ে একটি অভিযান চলছে এবং বিকেলে আসতে বলা হয়। কিন্তু পরে তারা আবার গেলে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিরাজ কখনোই তাদের হেফাজতে ছিলেন না।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেখানে তার মোটরসাইকেলটি রেখে যাওয়া হয়েছিল। দোকানের মালিক সংস্থাটিকে জানান, ২১ এপ্রিল এক ব্যক্তি কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে এসে মোটরসাইকেলের তালা খুলে নিয়ে যান। তবে পরদিন কোস্টগার্ড সদস্যরা সেটি আবার ফিরিয়ে দেন।
মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা গুমের সময়, স্থান, পরিস্থিতি এবং কীভাবে কোস্টগার্ড সদস্যরা মিরাজকে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, মিরাজের পরিবার থানায় অভিযোগ করেছে, সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও করেছে। কিন্তু এতেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরে গত ১২ জুলাই মিরাজের বাবা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের পশ্চিম জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, ঘটনাটি অতীতে জোরপূর্বক গুমের যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তার সঙ্গে উদ্বেগজনক মিল রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি দেখাচ্ছে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। স্পষ্ট যে, এসব চর্চা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’
এইচআরডব্লিউ বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর এমন একটি স্বাধীন সংস্থা গঠনের ব্যাপারে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, যার হাতে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করিয়ে বর্তমান সরকার এমন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যাতে গুমের তদন্ত পুলিশের হাতেই থাকবে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত হয়ে যাবে। পাশাপাশি কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রভাব বাড়বে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘সরকারের উচিত প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর সব ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ দূর করা এবং জোরপূর্বক গুম তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশকে দিয়ে গুমের তদন্ত করালে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধও তৈরি হবে না।’
খবরটি শেয়ার করুন