ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
আহমেদ রাজু
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে ব্যালট পেপারে থাকবে না বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন স্থগিত এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ দেশত্যাগ বা আত্মগোপনে। তবুও নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ভোটের আলোচনায় ততই আলোচিত হচ্ছে; একটি প্রশ্ন—নৌকার ভোট যাবে কোথায়?
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন করা হলেও দলটিকে বাদ দিয়ে ভোটের অঙ্ক কষা যাচ্ছে না। বরং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার-কৌশল দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটারদের ঘিরেই। রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন যে, কোনো দলই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে দেখতে চায় না, কিন্তু বিজয় নিশ্চিত করতে তারা সবাই চায় আওয়ামী লীগের ভোট।
অনুপস্থিত দল, উপস্থিত ভোট
৭০ বছরের বেশি পুরোনো আওয়ামী লীগের রয়েছে বিশাল ও বিস্তৃত সমর্থকগোষ্ঠী। দলটি নির্বাচনে না থাকলেও এই ভোটারদের সংখ্যা ও প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে মফস্বলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বহু নির্বাচনে ফল নির্ধারণী ভূমিকা রেখেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্থগিত করে নিবন্ধন। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু দল না থাকলেও ভোটাররা আছে—এবং সেই ভোটারদের সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ট্রাম কার্ড।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বনাম বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ্যে বলছে, তারা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে চায়। সে কারণে আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এই আহ্বানের কার্যকারিতা নিয়ে বড় সন্দেহ রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা, হামলা, গ্রেপ্তার ও মামলার অভিযোগ রয়েছে। বহু নেতাকর্মী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, অনেকে আছেন আত্মগোপনে। যারা এলাকায় আছেন, তারাও ভোটকেন্দ্রে গেলে নিরাপত্তা পাবেন কি না—সে বিষয়টিও নিশ্চিত নয়।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের একাধিক স্থানীয় সংগঠক জানিয়েছেন, দলীয়ভাবে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার বার্তা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চলছে যে আসন্ন নির্বাচন কোনো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। শেখ হাসিনার বক্তব্য—'যেখানে নৌকা নেই, সেখানে কীসের ভোট'—দলটির কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
বিএনপির বিশ্লেষণ
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ জানা গেছে, যেখানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের তৃণমূলের একটি বড় অংশ ভোট দেবে না।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে—
•আওয়ামী লীগের মোট ভোটের ৩৫ শতাংশ অন্য দলগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে।
• ৪৫–৫৫ শতাংশ ভোট বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে।
• ১৫–২০ শতাংশ ভোট জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো পেতে পারে।
• ১৫–২০ শতাংশ ভোট শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে যেতে পারে।
• অন্তত ১০–২০ শতাংশ ভোটার পুরোপুরি ভোটদান থেকে বিরত থাকতে পারেন।
এই ধারণা তৈরি করা হয়েছে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে, যেখানে দেখা গেছে—আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে তাদের ভোট পুরোপুরি অন্যদের ঘরে যায় না।
জরিপেও একই চিত্র
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায় বিএনপি ও জামায়াত। উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ভোট দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
জরিপে উঠে এসেছে—
• আওয়ামী লীগ না থাকলে বিএনপির সম্ভাব্য ভোট ৪৫ শতাংশের বেশি।
• জামায়াতের সম্ভাব্য ভোট ৩০ শতাংশের উপরে।
• ৮ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিতেই যাবেন না।
একই সঙ্গে জরিপে অনেকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ থাকলে তারা দলটিকেই ভোট দিতেন। এতে প্রতীয়মান হয়—দলটির ভোটব্যাংক এখনো সক্রিয়।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা: ভোটারদের দ্বিধা
হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর–চুনারুঘাট) আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক কর্মী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এখানে আওয়ামী লীগের ৩০–৪০ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে না-ও যেতে পারেন। কিছু ভোট যাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে, কিছু বিএনপির দিকে। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় অংশ ভোটে অনাগ্রহী থাকতে পারে।
এই চিত্র কেবল একটি আসনের নয়; বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা কাজ করছে।
আওয়ামী লীগের ভোট টানার প্রতিযোগিতা
যদিও কোনো দলই প্রকাশ্যে চায় না আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আসুক, কিন্তু বাস্তবে প্রায় সব দলই আওয়ামী লীগের ভোট চায়। বিএনপি প্রকাশ্যে বলছে, আওয়ামী লীগের ‘নির্দোষ’ কর্মীদের ক্ষতি করা হবে না। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগের ‘ভালো মানুষদের’ কাছে ভোট চাওয়ার বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
জামায়াতে ইসলামী আরও একধাপ এগিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে যোগ দিলে ‘দায়-দায়িত্ব নেওয়ার’ ঘোষণা দিয়েছে। মামলা প্রত্যাহার, এলাকায় ফেরার নিরাপত্তা, রাজনৈতিক পুনর্বাসনের আশ্বাস—এসব বার্তা স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এনসিপি শুরু থেকেই ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা সমঝোতার কথা বলছে। দলটির নেতারা বলছেন, যারা ফৌজদারি অপরাধে জড়িত নন, এমন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে চান। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও স্থানীয় পর্যায়ে আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন।
সহিংসতা ও ভয়ের প্রভাব
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার বড় অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়ে গেছে—কখনো ভুক্তভোগী হিসেবে, কখনো সংঘাতের অংশ হিসেবে।
এই সহিংসতার স্মৃতি এবং চলমান মামলার ভয় আওয়ামী লীগের ভোটারদের বড় একটি অংশকে ভোটকেন্দ্রবিমুখ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না—এটি একটি বাস্তবতা। কিন্তু দলটির ভোটাররা কী করবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একদিকে দলীয় নির্দেশনা, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষোভ; অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের লাগাতার টানাটানি—এই দ্বন্দ্বের মাঝেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে নৌকার ভোটারদের।
নৌকা ব্যালটে নেই, কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে নৌকাই এখন সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। এই ভোট কোন দিকে যাবে—নাকি আদৌ যাবে না—তার ওপরই নির্ভর করছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল, অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক বৈধতার ভবিষ্যৎ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
খবরটি শেয়ার করুন