রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ফের সোনার দামে বড় পতন, ভরিপ্রতি যত হলো *** জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতির আশা *** ফ্রান্সে ৪ লাখ মানুষের বিক্ষোভ, বাড়ছে উত্তেজনা–সংঘর্ষ *** আজই ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প *** সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম-কানুন পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর *** টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ *** তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব *** সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে বাধা, গোপনে গার্ড অব অনার *** মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করে এসি ল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট, পরিবারের দাবি মানসিক সমস্যা

নতুন ট্রেন্ড ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ আসলে কী

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন, ১৭ই আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন দুজন। হাতে হাত রেখে চেক-ইন করলেন। লাগেজ জমা দিলেন। নিরাপত্তা তল্লাশিও পার হলেন একসঙ্গে। তারপর হঠাৎ দুজনের পথ আলাদা। একজন গেলেন কফি খেতে। অন্যজন ঢুকে পড়লেন দোকানে। কেউ বই নিয়ে বসলেন। কেউ আবার বোর্ডিং গেটের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলেন। তবে এ বিচ্ছেদ চিরদিনের নয়। বরং কয়েক ঘণ্টার।

বিমান ছাড়ার আগে আবার দেখা হবে। হয়তো গেটের সামনে। হয়তো উড়োজাহাজের দরজায়। তখন দুজন আবার পাশাপাশি বসবেন। গন্তব্যে পৌঁছে শুরু হবে ছুটি। শুরু হবে নতুন গল্প।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত এমনই এক ভ্রমণ-প্রবণতার নাম ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’। নামটি শুনে যতটা ভয় পাওয়ার কথা, বিষয়টি আসলে ততটাই মজার। এর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর উদ্দেশ্য উল্টো। সম্পর্ককে আরও স্বস্তিদায়ক রাখা।

ব্রিটিশ ভ্রমণ লেখক হিউ অলিভার ২০২৫ সালে ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এনডিটিভি, ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ও ‘কসমোপলিটান ইন্ডিয়া’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চলতি বছর জুলাইয়ে ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘ফোর্বস’ এবং ‘দ্য উইক’-এর মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

হিউ অলিভারের ভাবনাটি খুব সহজ। বিমানবন্দরে পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাজগুলো একসঙ্গে করা হবে। চেক-ইন, লাগেজ জমা, নিরাপত্তা তল্লাশি—সবই। এরপর কিছু সময়ের জন্য দুজন দুদিকে চলে যাবেন। নির্ধারিত বোর্ডিং গেটে আবার দেখা হবে। কারণ, ভ্রমণের আনন্দ শুরু হওয়ার আগেই বিমানবন্দর অনেক সময় ক্লান্তির জায়গা হয়ে ওঠে।

একজন হয়তো তিন ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে চান। আরেকজন মনে করেন, এক ঘণ্টা আগে গেলেই যথেষ্ট। একজন নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়েই গেট খুঁজতে শুরু করেন। অন্যজন তখন কফির দোকান খুঁজছেন। কেউ চান দোকান ঘুরে দেখতে। কেউ চান চুপচাপ বসে থাকতে। এই ছোট ছোট পার্থক্য থেকেই কখনো কখনো শুরু হয় মনোমালিন্য।

‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ও ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ নিয়ে প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ভ্রমণের সময় দম্পতিদের অভ্যাস ও পছন্দের পার্থক্য সামলানো গুরুত্বপূর্ণ। কারও পছন্দ দ্রুত সব কাজ শেষ করা। কেউ আবার ধীরে, নিজের মতো করে সময় কাটাতে চান। গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একে অপরের ব্যক্তিগত পছন্দ ও জায়গাকে সম্মান করা ভ্রমণের আনন্দ বাড়াতে পারে।

বিমানবন্দর কেন এতটা চাপ তৈরি করে, তারও একটি ব্যাখ্যা আছে। এখানে সময়ের চাপ থাকে। থাকে নিরাপত্তা তল্লাশির দুশ্চিন্তা। থাকে গেট পরিবর্তনের ভয়। কখনো ফ্লাইট দেরি করে। কখনো খাবারের জন্য দীর্ঘ সারি। কখনো লাগেজ নিয়ে সমস্যা। এর সঙ্গে যোগ হয় উড়োজাহাজে ওঠার স্বাভাবিক উদ্বেগ।

‘ফোর্বস’-এ মনোবিজ্ঞানী মার্ক ট্রাভার্স লিখেছেন, বিমান ভ্রমণের চাপ মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিতে পারে। একজনের উদ্বেগ অন্যজনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ছোটখাটো বিরক্তি দ্রুত ঝগড়ায় রূপ নিতে পারে। কিছু সময় আলাদা থাকলে প্রত্যেকে নিজের মতো করে সেই চাপ সামলানোর সুযোগ পান। পরে যখন দুজন আবার মিলিত হন, তখন মেজাজও থাকে অনেকটা স্বাভাবিক। এ কারণেই ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’কে কেউ কেউ সম্পর্ক বাঁচানোর ছোট্ট কৌশল বলছেন।

এর পেছনে অবশ্য বিমানবন্দরে মানুষের আচরণ বদলে যাওয়ার একটি মজার তথ্যও আছে। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের করা এক জরিপে যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ২৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নিয়েছিলেন। তাদের ৫৪ শতাংশ বলেছে, বিমানবন্দরে গেলে তাদের আচরণ বা ব্যক্তিত্বে এক ধরনের পরিবর্তন আসে। জরিপে যাত্রীদের বিভিন্ন ধরনের ‘বিমানবন্দর ব্যক্তিত্ব’-এর কথাও বলা হয়। কেউ সবকিছু আগেভাগে গুছিয়ে রাখেন। কেউ আবার অন্যের ওপর ভরসা করে চলেন। কেউ বিমানবন্দরের ভেতর দ্রুত ছুটে বেড়ান। আবার কেউ ধীরে ধীরে হাঁটেন, দোকান দেখেন, সময় নেন।

অর্থাৎ বিমানবন্দরে সবাই একই মানুষ নন। একজনের কাছে বিমানবন্দর হলো দায়িত্বের জায়গা। আরেকজনের কাছে সেটিই ভ্রমণের প্রথম আনন্দ। একজনের চোখ ঘড়িতে। অন্যজনের চোখ দোকানের কাচে। এখানেই ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’-এর যুক্তি। যদি দুজনের ভ্রমণের ধরন আলাদা হয়, তবে কেন একজনকে অন্যজনের পছন্দ মেনে চলতে হবে? বরং কিছু সময় আলাদা থাকাই হয়তো ভালো। এতে কারও আনন্দ নষ্ট হয় না। কারও ওপরও চাপ পড়ে না।

‘ট্রাভেল নোয়ার’ সম্প্রতি লিখেছে, এই প্রবণতায় দম্পতিরা নিরাপত্তা তল্লাশি শেষ করার পর আলাদা হয়ে যান। একজন লাউঞ্জে বসতে পারেন। অন্যজন দোকান ঘুরে দেখতে পারেন। কেউ খাবার খেতে পারেন। কেউ আবার নীরবে বসে থাকতে পারেন। বোর্ডিংয়ের আগে তারা আবার একসঙ্গে হন। তবে সবাই যে বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন, তা নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ভ্রমণসঙ্গীর সঙ্গে বিমানবন্দরেই যদি একসঙ্গে থাকা না যায়, তাহলে একসঙ্গে ভ্রমণের মানে কী? কারও কারও মতে, মানুষের স্বাভাবিক আচরণের জন্য এখন নতুন নতুন নাম দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কেউ বলেছেন, এটি পুরোনো একটি অভ্যাসকে নতুন নাম দেওয়ার আরেকটি উদাহরণ। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, একসঙ্গে থাকা মানেই সব সময় একসঙ্গে থাকা নয়। ভালোবাসার মানুষটির পাশে থাকার অর্থ তার প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করা নয়। কখনো কখনো একটু দূরে দাঁড়িয়েও কাছের মানুষটিকে ভালোবাসা যায়।

বরং ব্যক্তিগত পরিসর সম্পর্ককে আরও সুন্দর করতে পারে। ধরা যাক, একজন বই পড়তে চান। অন্যজন বিমানবন্দরের দোকানে ঘুরতে চান। দুজন যদি নিজেদের ইচ্ছা ছেড়ে শুধু একসঙ্গে থাকার জন্য বসে থাকেন, তাতে হয়তো বিরক্তি তৈরি হবে। কিন্তু একজন বই পড়লেন, অন্যজন নিজের পছন্দের দোকান ঘুরলেন। তারপর দুজন যখন গেটে এসে আবার পাশাপাশি বসলেন, তখন তাদের বলার মতো নতুন গল্পও তৈরি হলো। এই জায়গাটিই হয়তো ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’-এর সবচেয়ে সুন্দর দিক। এটি আসলে বিচ্ছেদ নয়। বরং সামান্য বিরতি। সম্পর্ক থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং সম্পর্ককে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

তবে এর জন্য কিছু বিষয় আগে ঠিক করে নেওয়া জরুরি। কখন আলাদা হবেন, কোথায় আবার দেখা করবেন, কার কাছে বোর্ডিংয়ের তথ্য থাকবে—এসব স্পষ্ট থাকা দরকার। বিশেষ করে যারা প্রথমবার ভ্রমণ করছেন, বয়স্ক যাত্রী বা শিশুদের সঙ্গে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ‘দ্য উইক’-এর আলোচনাতেও বলা হয়েছে, যাদের ভ্রমণের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে হয়, তাদের জন্য এই পদ্ধতি সব সময় উপযোগী নাও হতে পারে।

সবশেষে তাই ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ কোনো সম্পর্কের পরীক্ষা নয়। এটি সম্পর্কের গভীরতারও মাপকাঠি নয়। বরং এর বার্তাটি খুব সাধারণ। তুমি তোমার মতো একটু সময় কাটাও, আমি আমার মতো থাকি। তারপর আবার দেখা হবে। একটি বিমানবন্দরের ব্যস্ত ভিড়ের মধ্যে দুজন মানুষ কিছু সময়ের জন্য আলাদা পথে হাঁটলেন। একজনের হাতে বই। অন্যজনের হাতে কফি। দুজনের চোখে আলাদা আলাদা ব্যস্ততা।

কিন্তু দুজনের গন্তব্য একই। বোর্ডিং গেটে যখন আবার দেখা হবে, হয়তো একজন মৃদু হেসে বলবেন, ‘চলো।’ অন্যজনও হয়তো বলবেন, ‘চলো।’ তারপর দুজন পাশাপাশি বসবেন। উড়োজাহাজ আকাশে উঠবে। নিচে পড়ে থাকবে বিমানবন্দরের সব ব্যস্ততা, সব ছোটখাটো অভিমান। আর সামনে থাকবে একটি নতুন শহর। একটি নতুন সকাল। আর দুজন মানুষের একসঙ্গে কাটানোর আরও কিছু সুন্দর সময়।

সেই অর্থে ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ হয়তো বিচ্ছেদের গল্প নয়। বরং ভালোবাসার ভেতর একটু জায়গা রাখার গল্প। যেখানে কাছে থাকার পাশাপাশি দূরে থাকারও অধিকার আছে। যেখানে স্বাধীনতা আর সঙ্গ—দুটিই পাশাপাশি হাঁটতে পারে।

এয়ারপোর্ট ডিভোর্স

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250