শায়লা শবনম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের বৈধতা নিয়ে যে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে, তা এখন কার্যত এক গভীর সাংবিধানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সংসদ থেকে শুরু করে আদালত—সব জায়গায় গণভোটের আইনগত ভিত্তি, প্রশ্নমালা এবং ফলাফল বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র মতভেদ ও চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।
সরকারি ও বিরোধী পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান, হাইকোর্টে রিট এবং সংসদে চলমান বাকবিতণ্ডা মিলিয়ে গণভোট প্রশ্নটি এখন 'বৈধতা সংকট'–এর কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশ্লেষকদের মতে, আদালত এবং সংসদের ভেতরে-বাইরে এই সংকট ঘনীভূত হওয়ায় অন্তবর্তী সরকারের গণভোট এখন আইসিইউতে। বেঁচে ফিরে আসার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
গত মঙ্গলবার সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে জাতীয় ঐকমত্য ও জুলাই সনদ নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের সূচনা হয় এনসিপি নেতা আখতার হোসেন এবং গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকির মধ্যে।
আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, গণভোটের চারটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে এবং বিরোধীদের প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, অতীতের গণভোটে বহু দফা থাকলেও প্রশ্ন বিভাজন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়নি।
জবাবে জোনায়েদ সাকি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ছিল মূলত জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ার কথা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিকে চারটি প্রশ্নে সীমিত করা হয়েছে। তার মতে, এ প্রক্রিয়ায় “ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্যও নিশ্চিত হয়নি”, ফলে গণভোটের কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ।
এই বিতর্কের মধ্যেই সংসদে অন্য এক তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন রাজশাহী-১ আসনের এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, গণভোট যদি কার্যকরভাবে সংসদ শপথের আওতায় না আনা হয়, তবে সংসদ সদস্যদের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তার ভাষায়, “শেষ পর্যন্ত আমও যাবে, ছালাও যাবে”— অর্থাৎ পুরো সাংবিধানিক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভোটে প্রস্তাবিত এই পরিষদ গঠন আদৌ সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে আইনজীবী ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীরা বলছেন, এটি সংসদীয় সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে পারে, অন্যদিকে সরকারপক্ষ একে 'সংস্কার প্রক্রিয়ার অপরিহার্য ধাপ' হিসেবে দেখছে।
গণভোটের ভবিষ্যত কী হবে- তা নিয়ে আইনি অঙ্গনেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একাধিক রিট দায়ের করা হয়। সেই রিটে গণভোটের বৈধতা, সাংবিধানিক স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোট এবং ১৩ ফেব্রুয়ারির গেজেটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব, আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতের দিকগুলো তাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ বা কোনো সাংবিধানিক সভা (গণপরিষদ) নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক ট্রাস্টি, যা কঠোরভাবে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ আনুষ্ঠানিক নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, যা ভঙ্গ করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
রিটের পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ জানান, 'সংবিধানে গণভোট আয়োজনের স্পষ্ট কোনো বিধান নেই এবং নির্বাচন কমিশনের কোনো গণভোট পরিচালনার ক্ষমতা নেই।' একই সঙ্গে তারা ইসির জারি করা গত ১৩ ফেব্রুয়ারির গেজেট বাতিলসহ ফলাফল বাস্তবায়ন স্থগিত করার আবেদন জানান।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে ফলাফল ঘোষণা করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, এতে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। অন্যদিকে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। অর্থাৎ, ‘না’–এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছে ‘হ্যাঁ’।
ফলাফল অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে জয়যুক্ত হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই এখন বিতর্ক তুঙ্গে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রায় দ্বিগুণ বেশি হলেও বিরোধীরা এটিকে 'প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার ফল' হিসেবে অভিহিত করছে।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে চলমান এই দ্বন্দ্ব এখন স্পষ্টতই একটি সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে গণভোটের প্রশ্ন, প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন— তিনটি স্তরেই আইনগত অস্পষ্টতা থাকায় বলা যায় পুরো উদ্যোগটি এখন 'বৈধতা সংকটের আইসিইউতে' রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া কোনো টেকসই পথ নেই। কিন্তু সংসদীয় বক্তব্য, আদালতের রিট এবং রাজনৈতিক অবস্থান— সব মিলিয়ে সেই ঐকমত্য এখনো দূরবর্তীই থেকে যাচ্ছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন