রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সরকারপন্থী সবচেয়ে বড় সমাবেশ, লাখো মানুষের উপস্থিতি *** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের

সুখবর এক্সপ্লেইনার

চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রেলে ৪৫ হাজার কোটি বিনিয়োগ করবে ভারত, উদ্দেশ্য কী

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৯ অপরাহ্ন, ৩রা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করে রেল অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাকে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাব, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ এবং সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী এসব অঞ্চলে যে বিনিয়োগ হবে, তা আগামী দুই বছরে ভারতের মোট পরিকল্পিত রেল অবকাঠামো ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত প্রতিযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান নিরাপত্তা উত্তেজনা এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নয়াদিল্লি তার পূর্ব ও উত্তর সীমান্তে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত রেলপথগুলোর বড় অংশই হবে ‘ডুয়াল ইউজ’ বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য। অর্থাৎ, এগুলো সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি যুদ্ধ বা সংকটকালে সেনা, ভারী সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও রসদ দ্রুত সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যাবে। সামরিক কৌশলবিদদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা অনেক সময় অস্ত্রের সংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই বিবেচনায় সীমান্ত পর্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এর আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তের কাছাকাছি প্রায় ৩০ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে নতুন রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই রেলপথগুলো সীমান্তবর্তী সড়ক অবকাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং দুর্গম এলাকায় সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহনের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে।

ভারতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি হলো শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’। মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এই স্থলপথ ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে নেপাল, ভুটান ও চীনের নিকটবর্তী এই করিডরকে ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয়। এই করিডরের রেল সক্ষমতা বাড়ানো মানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।

ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত এক দশকে ভারত সীমান্তবর্তী অবকাঠামো উন্নয়নে নজিরবিহীন বিনিয়োগ করেছে। নতুন সড়ক, টানেল, সেতু, বিমানঘাঁটি ও রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে সীমান্তে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করাও সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মিত হয়েছে এবং ৭২ হাজার কোটিরও বেশি রুপির বিভিন্ন রেল প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই পরিকল্পনার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক চীন। ২০১৭ সালে ডোকলাম অচলাবস্থা এবং ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশই সীমান্তে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু করে। চীন তিব্বত অঞ্চলে নতুন রেলপথ, মহাসড়ক, বিমানবন্দর, হেলিপোর্ট এবং সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ জোরদার করেছে। এর জবাবে ভারতও সীমান্তে ‘অল-ওয়েদার’ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করেছে।

তবে পরিকল্পনার ভৌগোলিক বিস্তৃতি থেকে স্পষ্ট, এটি শুধু চীনকে ঘিরেই নয়। পাকিস্তান সীমান্তে পাঞ্জাব ও রাজস্থানে নতুন রেল প্রকল্প এবং বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও একই ধরনের উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে তিনটি সীমান্তকেই ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতীয় বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। যদিও দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহাল রয়েছে, তবুও নয়াদিল্লি এখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী রাখতে আগ্রহী। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রেল অবকাঠামো উন্নয়নকে তারা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পকে আঞ্চলিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক বাজেটেও রেল অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতীয় রেলের জন্য রেকর্ড ২ দশমিক ৯৩ লাখ কোটি রুপি মূলধনী ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার বলছে, উচ্চগতির রেল, মালবাহী করিডর, নিরাপত্তা এবং সীমান্ত অঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়নই এই বিনিয়োগের প্রধান লক্ষ্য।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক রেল অবকাঠামো কেবল যুদ্ধকালীন প্রয়োজনই পূরণ করে না; এটি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শিল্প, পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। ফলে একই প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক—দুই ধরনের সুবিধাই পাওয়া সম্ভব।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের এই বিনিয়োগকে তাই বহুমাত্রিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে এটি সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন অবহেলিত সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন গতি আনতে পারে।

চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় একই সময়ে এত বড় রেল বিনিয়োগ ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অবকাঠামো আঞ্চলিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের প্রধান আগ্রহের বিষয়।

ভারত

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250