ফাইল ছবি
একজন সাংবাদিকের হাতে অস্ত্র থাকে না। থাকে প্রশ্ন। কখনো সেই প্রশ্ন ধারালো। কখনো অস্বস্তিকর। কখনো ক্ষমতাবান রাজনীতিকের মুখের হাসি মুছে দিতে পারে। আবার কখনো ক্ষমতাবানকে প্রশংসায় ভাসাতেও পারে। কিন্তু প্রশ্নটি প্রশ্নই থাকে। গণতন্ত্রে সেটিকে অপরাধ বানানো যায় না।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের কারাবন্দিত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এখন এই মৌলিক প্রশ্নটিই ফিরে এসেছে। সাংবাদিকের প্রশ্ন কি কোনো অপরাধের প্রমাণ হতে পারে? রাজনৈতিক পক্ষপাত বা কোনো সরকারের প্রতি আনুগত্য কি নিজেই ফৌজদারি অপরাধ? সাংবাদিকের সম্পাদকীয় অবস্থান অপছন্দ হলেই কি তাকে হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে রাখা যায়?
গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, ভোরের কাগজের সাবেক সম্পাদক শ্যামল দত্ত এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন-সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে রাখার আদেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগের একটি অংশ হলো, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা কিছু প্রশ্ন ও মন্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানির অংশ ছিল।
এই অভিযোগের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ওই বক্তব্যের পর রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন পরে আরও তীব্র হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ ছাড়েন। আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। যারা হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
কিন্তু এখানেই আলাদা করতে হবে দুটি বিষয়। সাংবাদিকের রাজনৈতিক অবস্থান এক জিনিস। অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণ আরেক জিনিস।
এই পার্থক্যটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন—সিজেএ। গতকাল দেওয়া সর্বশেষ বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, সংবাদ সম্মেলনে একজন রাজনৈতিক নেতাকে প্রশ্ন করা, প্রশ্নটি যতই বিতর্কিত হোক, সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্বের মৌলিক অংশ। শুধু প্রশ্ন করার কারণে সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
সিজেএ আরও বলেছে, সাংবাদিককে সত্যিকারের অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে জবাবদিহির আওতায় আনা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন করা, ঘটনা প্রতিবেদন করা কিংবা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে সাংবাদিককে অপরাধী বানানো উচিত নয়। সংগঠনটি সতর্ক করেছে, সাংবাদিকতার পেশাগত কাজকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় আনা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
সিজেএর ভাষায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো সরকারের দেওয়া অনুগ্রহ নয়। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য শর্ত। এই কথাটিই বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা দরকার।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানও একই জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথম আলোতে প্রকাশিত তার ‘প্রমাণ ছাড়া এসব গ্রেপ্তার থামাতেই হবে’ শিরোনামের কলামে তিনি লিখেছেন, কারাবন্দী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কেউ কেউ সেই সরকারের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্য নিজেই অপরাধ নয়।
বার্গম্যানের বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তিনি ২০২৪ সালের ২৩ জুলাইয়ের এডিটরস গিল্ডের বৈঠকের প্রসঙ্গ টানেন। তার মতে, সাংবাদিক শাকিল আহমেদ ও মোজাম্মেল বাবু সেখানে আন্দোলনকারীদের নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন, যার কিছু অংশ ছিল কঠোর এবং ধাক্কা দেওয়ার মতো। কিন্তু সেই বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর আহ্বান বা সমর্থনের প্রমাণ নেই। তার যুক্তি, বক্তব্য পছন্দ না হওয়া আর হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
বার্গম্যান আরও বলেছেন, বর্তমানে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে নির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই অপরাধের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি। তার মতে, অনেক মামলা আহত বা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের করা এজাহারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এজাহারে নাম থাকা আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা, গোলাগুলির অর্থ জোগানো কিংবা তা উসকে দেওয়ার প্রমাণ থাকা এক নয়।
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগের জায়গায় মিল রয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে। কিন্তু অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণের সম্পর্কও থাকতে হবে। আইনের শাসনের সবচেয়ে সাধারণ কথাটিই এখানে সবচেয়ে জরুরি।
চলতি বছরের ৩ মে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ডেইলি স্টার জানায়, পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তখন ৫৯৩ থেকে ৬২০ দিন পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। তারা হলেন ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবির। ওই সময় তাদের কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মামলার সংখ্যাও কম নয়। ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে নয়টি, শাকিল আহমেদ ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আটটি করে, শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে ছয়টি এবং শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে অন্তত নয়টি মামলা ছিল। আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেছিলেন, নিম্ন আদালত থেকে জামিন পাওয়ার আশাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি মামলায় জামিন হলে অন্য মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শাহরিয়ার কবিরের বিষয়টি আরও গুরুতর। জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ তার আটককে নির্বিচার বলে মত দিয়েছিল এবং তার মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মতামতে তার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি নেই বলে ওয়ার্কিং গ্রুপ উল্লেখ করেছিল। ২০২৬ সালেও তিনি কারাগারে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটি—সিপিজে—এপ্রিল ২০২৬-এ দেশের আইনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং তাদের মুক্তির আহ্বান জানায়। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। মামলাগুলোর ধরন তাদের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলেও সিপিজে উল্লেখ করে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও গত জুলাইয়ে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংস্থাটি বলেছে, বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ পরিবেশন ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সাংবাদিকতার কাজকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা সংবাদমাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এদিকে ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ঘটনা ঘটেছে। মে মাসে হাইকোর্ট শাকিলকে পাঁচটি এবং রূপাকে ছয়টি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিলেন। কিন্তু আরেকটি মামলায় জামিন না হওয়ায় তারা তখনও মুক্ত হতে পারেননি। পরে জুনে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বিচারক ওই জামিনের আদেশ স্থগিত করেন। ফলে কারাগারের দরজা তাদের জন্য আবারও বন্ধ থাকে।
২৩ আগস্টের সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, শাকিল আহমেদ তখন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং ফারজানা রূপা মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে আটক। অর্থাৎ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া এই আটকপর্ব নতুন সরকারের সময়েও শেষ হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে মামলার বিস্তার ঘটেছে। চলতি বছরের আগস্টে এসে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও সামনে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকরা কি সবসময় নিরপেক্ষ থাকবেন? উত্তরটি সহজ নয়। সাংবাদিক মানুষ। তার রাজনৈতিক মত থাকতে পারে। তিনি কোনো দলের সমর্থকও হতে পারেন। কিন্তু তার পেশাগত কাজের জন্য শাস্তি দিতে হলে প্রমাণ করতে হবে তিনি কী অপরাধ করেছেন। শুধু তিনি কাকে সমর্থন করেন, কোন সরকারের সময় সুবিধা পেয়েছেন কিংবা কোন রাজনীতিকের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন—এসব দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দায় প্রমাণ হয় না। গণতান্ত্রিক বিশ্বে এই সীমারেখা প্রতিদিনই পরীক্ষা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রকাশ্য সংঘাত তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। গত ১৭ আগস্ট সিএনএন-এর সাংবাদিক ক্রিস্টেন হোমস ট্রাম্পকে তার সহযোগী ন্যাটালি হার্পকে ঘিরে বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করেন। ট্রাম্প তাকে ‘ফেক রিপোর্টার’ ও ‘অসম্মানজনক’ বলে আক্রমণ করেন। পরে হোয়াইট হাউসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকেও সাংবাদিকটির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। সিএনএন অবশ্য বলেছে, হোমস একজন সাংবাদিক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কঠিন প্রশ্ন করা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ। দ্য গার্ডিয়ান ঘটনাটিকে সংবাদমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক আক্রমণের আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। সাংবাদিকের প্রশ্ন রাজনৈতিক নেতাকে বিব্রত করতে পারে। প্রশ্নের কারণে নেতা রেগে যেতে পারেন। সাংবাদিককে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’, ‘অশ্রদ্ধাশীল’ বা ‘ভুয়া’ বলতেও পারেন। কিন্তু প্রশ্ন করার কারণে সাংবাদিককে হত্যা মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠানো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি নয়।
এমনকি প্রশংসামূলক প্রশ্নও সাংবাদিকতার জগতে অপরিচিত নয়। দ্য গার্ডিয়ান ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পপন্থী কিছু গণমাধ্যমকর্মীর নরম ও প্রশংসামূলক প্রশ্নের প্রবণতা নিয়ে লিখেছিল। অর্থাৎ সাংবাদিকের প্রশ্ন কখনো কঠিন, কখনো নরম। কখনো বিরোধী সুরের। কখনো সমর্থনসূচক। সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কারাগার—এটি আলাদা বিষয়।
আরেকটি উদাহরণও সাম্প্রতিক। চলতি আগস্টে ট্রাম্পের কাছে কঠিন প্রশ্ন করার পর সিএনএন সাংবাদিক ক্রিস্টেন হোমসের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পরও বিতর্কের কেন্দ্র ছিল সাংবাদিকের প্রশ্ন করার অধিকার ও রাজনৈতিক নেতার প্রতিক্রিয়া। প্রশ্নকারী সাংবাদিককে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি করার দাবি ওঠেনি।
অবশ্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোও নিখুঁত নয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সরকারি চাপ আসে। কখনো সাংবাদিক গ্রেপ্তারও হন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে জারি করা সমনকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বলে তুলে ধরেছে। কিন্তু এসব বিতর্কও শেষ পর্যন্ত আইনি সুরক্ষা, সাংবাদিকতার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়ে।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রশ্নটিও সরল। সাংবাদিক যদি হত্যায় অংশ নেন, প্রমাণ দিন। সহিংসতায় উসকানি দিলে প্রমাণ দিন। অর্থ জোগালে প্রমাণ দিন। অপরাধের পরিকল্পনা করলে প্রমাণ দিন। তারপর বিচার করুন। কিন্তু তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন, কোনো সরকারের প্রশংসা করেছেন, কোনো নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন কিংবা সংবাদ সম্মেলনে কঠিন বা বিতর্কিত প্রশ্ন করেছেন—এসবকে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ বানানো যাবে না। কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে পুরোনো কাজই হলো ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন রাখা।
আজ যে সাংবাদিক ক্ষমতাসীনকে কঠিন প্রশ্ন করছেন, কাল তিনি হয়তো অন্য সরকারের কাছে একই প্রশ্ন করবেন। আজ যে সাংবাদিককে সরকারপন্থী বলা হচ্ছে, কাল তার অবস্থান বদলাতে পারে। সরকার বদলায়। দল বদলায়। ক্ষমতার চেয়ার বদলায়। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্ন করার অধিকার বদলালে গণতন্ত্রের ভিতটাই নড়ে যায়। ২০২৪ সালের আন্দোলনে কী ঘটেছিল, কারা গুলি চালিয়েছিল, কার নির্দেশে চালিয়েছিল, কারা হত্যায় সহায়তা করেছিল—এসবের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার জরুরি। কিন্তু সেই বিচারকে সাংবাদিকতার পেশাগত কাজের বিচার থেকে আলাদা রাখাও সমান জরুরি।
কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ কথাটি তাই শুধু তিন সাংবাদিকের বিষয়ে নয়। এটি দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। সিজেএ বলেছে, সাংবাদিকতা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। এই সীমারেখা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। আদালতেরও দায়িত্ব। সাংবাদিকেরও দায়িত্ব। আর গণতন্ত্রেরও। কারণ প্রশ্ন বন্ধ হলে শুধু সাংবাদিক নীরব হন না। ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায় সমাজ।
আর যে সমাজে রাজনীতিককে প্রশ্ন করাই অপরাধ হয়ে ওঠে, সেখানে একদিন প্রশ্ন করার মতো মানুষও আর অবশিষ্ট থাকে না।
খবরটি শেয়ার করুন