ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব কীভাবে এগিয়ে নিতে চায় বর্তমান বিএনপি সরকার, তার সঙ্গে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি যুক্ত বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার ও বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।’
আজ মঙ্গলবার ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ এ এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলমান থাকায় এয়ারবাস বিক্রি নিয়ে এখনো ‘চিন্তিত’ না হওয়ার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা, আমরা মনে করি এটা অত্যাবশ্যকীয়।’
এয়ারবাস বিক্রিকে ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এটা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ! যদিও ১০টি উড়োজাহাজ বড় চুক্তি, কিন্তু এটা আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু। বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যাওয়ার জন্য আলোচনায় যুক্ত হতে বাংলাদেশ ইচ্ছুক। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ফ্রান্স রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। আপনি একটি চুক্তি করবেন এবং আর সরে পড়বেন, এমনটাতে আমরা বিশ্বাস করি না, এভাবে আমরা কাজও করি না। আমরা সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়তে চাই, যেভাবে অনেক ফরাসি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব রয়েছে।’
রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ‘এটা এমন না যে, শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ; এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়া।’
ইউরোপকে বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমেরিকায় ১৭ শতাংশের বিপরীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৪৮ শতাংশ যায় ইউরোপে। এটা তিন-এক অনুপাত। যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে এটা আরও বেশি। সুতরাং ইউরোপ হচ্ছে প্রধান অংশীদার। যখন আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করি, তখন কেবল একটা বিষয়ই স্মরণ করিয়ে দিই যে, আমাদের অভিন্ন স্বার্থ হচ্ছে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। কেননা, আপনার নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও আগ্রহী অংশীদার রয়েছে, যে আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার কথা চলছিল। বিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা মার্কিন জায়ান্ট বোয়িং না ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস-কার পাতে যাবে, সে নিয়ে তখন থেকেই একটা টানা-হেঁচড়া চলছিল। আওয়ামী লীগ সরকার শেষ দিকে এসে এয়ারবাসের পক্ষে ঝুঁকেছিল, এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছিলেন তখনকার বিমানমন্ত্রী মাহাবুব আলী।
৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত দেয়। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার চুক্তি করে সরকার।
এয়ারবাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলোচনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তা তুলে ধরে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, মিশ্র বহরের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভালো ‘কারিগরি কারণে’ বিমান বাংলাদেশ এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, ‘রাজনৈতিক কারণে নয়’। বিশ্বের বহু বিমান সংস্থা এয়ারবাসকে গ্রহণ করেছে, বিমানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনার মধ্যে আমেরিকান কোম্পানি বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এয়ারবাসের সঙ্গেও আগ্রহ বজায় রেখেছে বিমান এবং আলোচনা ও দর-কষাকষি এখনো চলমান। সুতরাং এতে সময় লাগতে পারে। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, দর-কষাকষি এখনো ভালোভাবে চলছে এবং ভালো ফলও আসছে।’
আগামী বছর ইউরোপের সঙ্গে চালু হতে যাওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দর-কষাকষির সঙ্গেও এয়ারবাস কেনার বিষয়টি মিলিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আপনি যদি ওই মানচিত্রে আরও বেশি পরিমাণে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। সেই বিবেচনায় এয়ারবাস গুরুত্ব বহন করে। কেন না, এটা ইউরোপকে কেবল একটি বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বেছে নেওয়া।’
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ৫০ শতাংশ ইউরোপে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এবং ইউরোপ কখনো বলে না, আমাদের এবং তাদের মধ্যে একজনকে বেছে নাও। আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। অংশীদারত্ব মানে বাদ দেওয়া নয়, অন্তর্ভুক্তি। সুতরাং ঢাকা ইউরোপকে কী বার্তা পাঠাচ্ছে, সেটা গুরুত্ব বহন করে।’
খবরটি শেয়ার করুন