ফাইল ছবি
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী বাসের চলাচল ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে গুলিস্তান অভিমুখী ফ্লাইওভার ব্যবহার করে বহু আন্তজেলা বাস রাজধানীতে প্রবেশ করতে থাকে। তবে যানজটের যুক্তি দেখিয়ে তিন বছর আগে এ পথে আন্তজেলা বাসের রুট পারমিট বাতিল করায় দূরপাল্লার বাস চলাচল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বন্ধ থাকা সেই রুট পারমিট অবশেষে আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ঢাকা-দক্ষিণাঞ্চল রুটে নৌপথে যাত্রী অনেক কমে যায়। অন্যদিকে সড়কপথে অনেক নতুন গাড়ি নামে। সেতু চালু হলে প্রতিদিনই নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশন হতে থাকে। রুট পারমিট বাতিল করার পরও বাস্তবতার কারণে এ পথে অনেক বাস চলাচল করতে থাকে।
বাস চলা অব্যাহত থাকলেও পারমিট না থাকায় সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে। পাশাপাশি সড়কের শৃঙ্খলাও ব্যাহত হয়েছে।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক সভায় যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা রুটে আন্তজেলা বাসের রুট পারমিট বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপসের নির্দেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গুলিস্তান ফ্লাইওভার দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী বাস চলাচলের অনুমতি বন্ধ করে দেয়।
হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরও বিআরটিএ নতুন কোনো রুট পারমিট দেয়নি। ফলে এক রুটের বাস অন্য রুটে চলে আসে। পুলিশ ধরলে চালকেরা বলেন, তারা আবেদন করেছেন; কিন্তু সরকার অনুমোদন দিচ্ছে না। তাই এ অবস্থায় পুলিশেরও কিছু করার থাকে না।
এ পরিস্থিতিতে রুট পারমিট জটিলতা কাটাতে উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ২৮শে জুলাই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা-গুলিস্তান ফ্লাইওভার ব্যবহার করে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী বাস চলাচলের জন্য রুট পারমিট দেওয়া হবে। সড়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিআরটিএ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ এবং পরিবহনমালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচলকারী বাসগুলোকে আবার রুট পারমিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। যানজট বাড়বে এই অজুহাতে স্থানীয় সরকার রুট পারমিট বন্ধ করেছিল। এ কাজটা বিআরটিএ করলে আইনগতভাবে সঠিক হতো। কারণ বিআরটিএ হলো রুট পারমিটের যথাযথ কর্তৃপক্ষ।’
এই অবস্থান বদলের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘জনস্বার্থে ২০২২ সালের যে অনুরোধে রুট পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছিল, তা এখন আর কার্যকর রাখার প্রয়োজন নেই। ফলে সিটি করপোরেশনের আর কোনো আপত্তি নেই রুট পারমিট নিয়ে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। দূরপাল্লার পরিবহনমালিকরা বলেছেন, বৈধ রুট পারমিট পাওয়ায় তাদের গাড়ি চলাচলে আর কোনো বাধা থাকবে না। এখন যাত্রা আরও স্বচ্ছন্দ হবে যাত্রীদের।
সড়ক পরিবহনমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, মেয়র তাপসের ক্ষমতার জোরে পদ্মা সেতুর রুট পারমিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যা আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। আনুষ্ঠানিক রুট পারমিট না থাকায় ম্যানেজ করে গাড়ি চলেছে। তা-ও পুলিশ মালিকদের বিভিন্ন স্থানে হয়রানি করেছে। দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকদের আরও বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তবে গত তিন বছরে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তির গাড়িকে ঠিকই পদ্মা সেতু রুটে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল বিআরটিএ।
বিআরটিএ রুট পারমিট শাখা সূত্র বলছে, পদ্মা সেতু হয়ে ১৬ রুটে প্রায় ১ হাজার ৭৭৫টি গাড়ির অনুমোদন আছে। এর মধ্যে ৫১৬টির রুট পারমিটের মেয়াদ শেষ। ১২৫৯টি বাসের রুট পারমিটের মেয়াদ আছে। গত তিন বছরে পারমিটের আরও ৭০০ থেকে ৮০০ আবেদন জমা পড়েছে, যা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমে থাকা আবেদন নিয়ে বাসমালিকেরা যোগাযোগ করলে যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার নিয়মিতভাবে রুট পারমিট ইস্যু এবং ফ্লাইওভারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করলে আন্তজেলা বাসের কারণে সৃষ্ট যানজট কিছুটা হলেও কমবে। পরিবহন খাতে অনিয়মও হ্রাস পাবে।
যানজটের বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) সুফিয়ান আহমেদ বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার দিয়ে আন্তজেলা বাস চলাচলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কোনো অসুবিধা হবে না। পরিবহনসংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ রুটে যাত্রীসেবা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের জেলায় চলাচল করা বাসগুলো পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর রুট বদলালেও নতুন পারমিট নেয়নি। এ কারণেই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের উচিত ছিল সেতু চালুর আগেই রুট পারমিট দেওয়া। এটা সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিকল্পনার ঘাটতি। রুট পারমিট বন্ধ করে রাখা কোনো সমাধান নয়।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন